জুন ১১, ২০২৩, ১২:১৪ এএম
অ্যাকাউন্ট হ্যাক ও আড়িপেতে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ
- মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে প্রতারকদের টার্গেট এখন ইউরোপ প্রবাসীরা
- দেশে গ্রেপ্তার হলেও বিদেশে অবস্থানরত প্রতারকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
- এমন মেসেজ পেলেই প্রকৃত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, মেসেজের মাধ্যমেও কোনো লিংক পেলে তাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে— সাইবার সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ
প্রবাসীদের টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে ইমো প্রতারক চক্র। একটা সময় মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা এ চক্রের টার্গেট হলেও এখন ইউরোপ প্রবাসীদেরও টার্গেট করে প্রতারণা বাড়িয়েছে চক্রটি। প্রবাসীদের ব্যক্তিগত ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এবং আড়িপেতে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। অন্যদিকে প্রবাসের কষ্টার্জিত অর্থ খোয়াচ্ছে প্রবাসীরা। দেশের সাধারণ মানুষের অ্যাকাউন্টও হ্যাক করে প্রতিনিয়তই ঘটছে প্রতারণার ঘটনা।
একাধিক ইউরোপ প্রবাসী আমার সংবাদকে জানান, প্রবাসীরা সাধারণত দেশের কারো কাছে টাকা চাইলে কেউ না করে না। এই সুযোগে প্রতারকরা ইমোতে বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে বার্তা পাঠিয়ে বিকাশ নাম্বার দিয়ে আর্থিক প্রতারণা করেই যাচ্ছে। তবে কোনো ভুক্তভোগী যদি অভিযোগ করেন তাহলেই কেবল এ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ। অন্যথায় পুলিশ প্রশাসনের এসব তথ্য জানার সুযোগও থাকে না।
সম্প্রতি পর্তুগাল প্রবাসী কুমিল্লার সিফাত (ছদ্মনাম) ইমো প্রতারক চক্রের খপ্পড়ে পড়েন। আমার সংবাদকে তিনি বলেন, মাসখানেক আগে পর্তুগাল থেকে ছুটিতে এসেছেন তিনি। চার মাস পর আবার ফিরে যাবেন। তিনি পর্তুগাল থেকে দেশে আসার মাস খানেকের মধ্যেই এমন কোনো পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়নি যে তিনি তার প্রবাসে থাকা অন্য আত্মীয়-স্বজনদের কাছে টাকা ধার চাইবেন। যদিও ঘটেছে তাই। তার অজান্তেই তার ব্যবহূত ইমো আইডি হ্যাক করে সৌদি আরব, দুবাই ও কাতারে থাকা প্রবাসী আত্মীয়সহ দেশে চাকরি করেন এমন আত্মীয়দেরও ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে টাকা চাওয়া হয়। সিফাতের ইমো অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ যাওয়ায় দেশে থাকা তার এক আত্মীয় ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর জন্য প্রস্তুতিও নেন। কিন্তু টাকা দেয়ার আগে ওই আইডিতে ফোন করা হলে প্রতারকরা ফোন রিসিভ করেনি। সিফাত জানান, যিনি আমাকে টাকা পাঠাতে চেয়েছিলেন তিনি এর কিছুদিন আগে আমার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। যে কারণে তিনি ভেবেছিলেন আমি সেই টাকা থেকেই চেয়েছি। যদিও প্রতারকরা ফোন না ধরায় তিনি অন্য এক আত্মীয়কে জানান এবং আমাকেও মুঠোফোনে ফোন দেন। তখনই মূলত আমি জানতে পারি আমার ইমো অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রবাসীরা নিঃস্ব হয়ে যাবে। এ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
একইভাবে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী একরামুল হক (ছদ্মনাম) আমার সংবাদকে জানান, তিনি সপরিবারে সুইজারল্যান্ড থাকেন। যে কারণে দেশে কাউকে সেভাবে টাকা পাঠাতে হয় না। মাঝেমধ্যে তার মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হয়। তাও তিনি সেখান থেকে লেনদেন করেন না। তিনি জানান, ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও রামপুরায় দুটি বাড়ি রয়েছে তার। সেখান থেকে প্রতিমাসে যে ভাড়া আসে সে টাকাও তিনি বিদেশে নেন না। দেশের ব্যাংকে রেখে দেন। সুতরাং সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে তার আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। তবে দেশে যেসব আত্মীয়-স্বজনরা রয়েছে তাদের অনেকেরই ইমো অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যোগাযোগের জন্য এটি ছাড়াও রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ। কিন্তু তার আত্মীয় এবং দুই বাড়ির দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারাও তার সঙ্গে ইমোতে যোগাযোগ করেন। যে কারণে তিনিও ইমো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। কিন্তু গত সপ্তাহে তার ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে একটি প্রতারক চক্র দেশে থাকা তার আত্মীয়-স্বজনদের বিভিন্নভাবে বিপদের কথা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়ে টাকা চায়। লেনদেন না থাকায় তার এক প্রতিবেশীর কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি একরামুল হককে জানান। তিনি তার আইডি থেকে সব আত্মীয়কে ফোন দিয়ে হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ওই অ্যাকাউন্টটি বাদ দিয়ে দেন।
আমার সংবাদকে তিনি বলেন, আমার দুই বাড়ির দায়িত্বে যারা আছেন তাদের না করে দিয়েছি ইমোতে যেন আর যোগাযোগ না করে। কারণ মাস শেষে বাড়ি ভাড়ার টাকা তুলে তারা আমাকে জানালে আমি তাদের জানিয়ে দেই কোথায় কত টাকা খরচ করতে হবে। হ্যাকাররা যদি জানতে পারে তাহলে টাকা খোয়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে দেখে আমি আমার সব আত্মীয়কেই বলেছি ইমো ব্যবহার বন্ধ করতে। এর কিছুদিন আগে একইভাবে প্রতারণার শিকার হন সৌদি প্রবাসী সোলায়মান মিয়া (ছদ্মনাম)। তিনি ১০টি ভিসার লেনদেন করেছিলেন সে সময়। ১০টি ভিসার লেনদেন ছিল প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো। সেই টাকা হাতিয়ে নেয়ার লোভে তার ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তার পরিবারের কাছে টাকা চাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা তার সাথে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়ার পর ওই অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া মেসেজের আর কোনো উত্তর দেননি। ইমোতে অধিকাংশ প্রতারণাই চলছে এভাবে। প্রবাসেও সক্রিয় এ চক্রের সদস্যরা। তারা বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ইমোতে ফোন করে প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে দাবি করছে মোটা অঙ্কের টাকা।
সাইবার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা ইন্টারেনেটের মাধ্যমে দেশে থাকা প্রবাসীর পরিবার ও প্রবাসীদের নম্বর সংগ্রহ করে একটি বিশেষ কোড বা পাসওয়ার্ড পাঠিয়ে প্রতারণার কৌশল নেয়। এরপর সেই ইমো আইডি হ্যাক করে। প্রতারকরা বেশিরভাগ সময়ই দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয়ে কল দেয় প্রবাসীদের কাছে এবং দেশে পরিবারের কাছের বন্ধু সেজে মেসেজ পাঠায়। ইমো অ্যাকাউন্টটি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই সাধারণত ওই অ্যাকাউন্টধারীর আত্মীয়-স্বজনের কাছে কল করে বা ম্যাসেজ পাঠিয়ে বিপদে থাকার কথা বলে টাকা ধার চায়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সন্দেহ হলেই বিদেশে থাকা প্রকৃত ব্যক্তির সঙ্গে ইমো ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যোগাযোগ করতে হবে। দেশের কোনো ইমোর মাধ্যমেও যদি এমন মেসেজ আসে তাহলেও অন্য কোনো উপায়ে প্রকৃত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তাহলেই সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং প্রতারণা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে। এছাড়া কেউ কল দিলে বা মেসেজের মাধ্যমে কোনো লিংক পাঠালে লিংকে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজনরাও। এদিকে দেশে মাঝে মধ্যে দু-একজনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও বিদেশের প্রতারকরা রয়ে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
