জুন ২৭, ২০২৩, ০১:১৬ এএম
‘আমাদের মতো গরিবদের ঈদ আসে না। সংসারে দুই টাকা বাড়তি পাঠানোর আশায় রাজধানীতেই ঈদ করব। এমনিতেই সংসারের খরচ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছি, এর মাঝে নিত্যপণ্যের দামে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। গত বছর সমাজ (এলাকাবাসী) থেকে কোরবানির গোশত দিয়েছে। এরপর আর গোশত খেতে পারিনি। এবারও সমাজের গোশত পাওয়ার আশায় আছি।’
এভাবেই নিজের ঈদুল আজহার উদযাপনের কথা জানিয়েছেন গাইবান্ধার মোহাম্মদ মাহবুব। রাজধানীতে রিকশা চালিয়ে ছয় সদস্যের সংসারের খরচ মেটান তিনি। শুধু মাহবুবই নন। রাজধানীতে এই প্রতিবেদক অন্তত ৩০ জনেরও বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। এদের মধ্যে আটজন রিকশাচালক, ১০ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (ভ্যানে কাপড় বিক্রেতা, ডিম বিক্রেতা, চা দোকানি), তিনজন মুচি, তিনজন লেগুনার ড্রাইভার, তিনজন অফিসের পিয়ন, তিনজন দারোয়ান। ওনাদের সবারই পরিবার আছে। তারা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে এসেছেন। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পাঁচ থেকে ১০ বছর ধরে রাজধানীতে থাকছেন। তাদের অধিকাংশই ঢাকায় ঈদ করবেন। ঈদের আনন্দ তারাও অনুভব করেন। কিন্তু বাস্তবতার কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। এদের কেউই কোরবানি দিতে পারেন না। তবে নিজেরা কোরবানি না দিতে পারলেও যারা দিচ্ছেন তারা সবার বাসায় গোশত পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও গোশত পেয়ে থাকেন। কয়েকজন গত এক বছরে গোশত খেতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। এবারের ঈদে কেউই নিজের জন্য নতুন জামা কিনতে পারবেন না। অনেকে পরিবারের সদস্যদেরও নতুন কাপড় দিতে পারবেন না।
ঈদুল আজহার স্মৃতিচারণ করে মতিঝিলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী (ডিম বিক্রেতা) আক্তার হোসেন জানান, একটা সময় ঈদ এলে অনেক পরিকল্পনা থাকত। বন্ধু সুজন, সোহেল, ফরিদদের সঙ্গে কত সুন্দর সময় কেটেছে। কোরবানির আগের দিন কোন বাড়ির কার কত বড় গরু আনত সেগুলো নিয়ে আলাপ হতো। ঈদের দিন দল বেঁধে গরু কোরবানি দেয়া দেখতে যেতাম। এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি, খেলাধুলা করতে যেতাম, ওই সময়গুলো আমাদের অনেক আনন্দ দিতো। কিন্তু এখন সন্তানদের সুখের কথা আমরা চিন্তা করি। ওদের আনন্দে রাখাই এখন আমাদের আনন্দ। গত ঈদে ওদের নতুন জামা কিনে দিয়েছি। এই ঈদে ওদের এখনো কিছু কিনে দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী লিটন মিয়া বলেন, সামান্য যে টাকা পাই, এ দিয়ে নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই কষ্ট হয়। এর মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ তো আছেই। মাসিক নিয়মিত ইনকামে সংসারে টানাপোড়েন লেগেই থাকে। এ অবস্থায় কোরবানি দেয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। আত্মীয়দের অবস্থাও আমাদের মতোই। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ত্যাগের মহিমায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তিনি বলেন, ঈদুল আজহার অর্থ ত্যাগের উৎসব। ইসলামে দুটি উৎসবের মধ্যে ঈদুল আজহা অন্যতম। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা মানুষের পশু প্রবৃত্তির কোরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার সুমহান বার্তা দেয়। ত্যাগের মধ্যেই এর সার্থকতা ও তাৎপর্য নিহিত। এই কোরবানি দেয়া সবার ওপর ফরজ নয়। সামর্থ্যবানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে কোরবানি দেবেন। সমাজে অনেকে কোরবানি দিতে পারেন না। সামর্থ্যবানদের উচিত তাদের খোঁজ নেয়া। তাদেরও এই উৎসবে শামিল রাখা।
