আব্দুল কাইয়ুম
অক্টোবর ২৭, ২০২৩, ১২:৪৭ এএম
মানসম্মত বাস সার্ভিস ও ছোট গাড়ি কমিয়ে সড়কের সক্ষমতা বাড়ালে যানজট কমে আসবে
—ড. আদিল মোহাম্মদ খান, সাধারণ সম্পাদক, বিআইপি
যানজট নিরসনে রাজধানীজুড়ে বেশকিছু মেগা প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও দেখা মিলছে না যানজটমুক্ত নগরীর। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। যানজট নিরসনে সরকার নানা প্রকল্প তৈরি করলেও সেগুলো ভালো কোনো ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মনে করছেন নগরবিদরা। এসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হলো মেট্রোরেল নির্মাণ। ২০১৬ সালে ২১.২৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৬ এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মোট ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ স্টেশনে যাত্রীরা সেবা পাচ্ছে। ছয়টি লাইন মিলিতভাবে দিনে ৪৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। উপরে মেট্রোরেল চালু হলেও নিচে ঠিকই রয়ে যাচ্ছে যানজট।
রাজধানীবাসী যেন যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পায় সেজন্য আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৬.৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে সরকার। শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী এলাকায় জনদুর্ভোগ কমাতে করা হয় এই প্রকল্প। রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনের জন্য এটিই হচ্ছে সরকার কর্তৃক গৃহীত সবচেয়ে বড় প্রকল্প। অথচ তাতেও তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
যানজট নিরসনে গত দুই দশকে প্রায় ১০টি উড়ালসড়ক ও সমজাতীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। এসব উড়ালসড়কের নির্মাণে ব্যয় মোট প্রায় ১৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। তার ধ্য দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি খরচে ১১.৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসেতু নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে সব যানবাহন এটিতে চলাচল শুরু করে। মানুষের যেন ভোগান্তি না হয় সেজন্য এটি নির্মাণ করলেও উড়ালসেতুর উপরই সৃষ্টি হয় যানজটের। টোলসহ নানা জটিলতার কারণে এসব যানজট তৈরি হয়। মহাখালী উড়ালসেতুটি ২০০৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। এটি নির্মাণে ১১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। যার দৈর্ঘ্য ১.১২ কিলোমিটার। ১.৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খিলগাঁও উড়ালসেতুটি ২০০৫ সালের মার্চ মাসে দুর্ভোগ কমাতে যানবাহন চলতে শুরু করে। যা নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৮১.৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু তাতেও সেই এলাকার যানজট কমেনি
২০১০ সালের এপ্রিল মাস থেকে বিজয় সরণির উড়ালসেতুটি জনসাধারণের জন্য ব্যবহার যোগ্য করে দেয় সরকার। ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ উড়ালসেতুটি বিজয় সরণির সাথে গুলশান, তিব্বত এবং সাত রাস্তাকে সংযোগ করলেও তাতে কমেনি ভোগান্তি। কুড়িল উড়ালসেতু দিয়ে ৩.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কে চারটি লুপ দিয়েই ওঠা-নামা করতে পারে সবাই। ৩০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটি ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে সবার জন্য খুলে দেয়া হয় যাতে সেখানকার যানজট হ্রাস পায়। ১.৭৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের জিল্লুর রহমান উড়ালসেতুটি ২০১৩ সালের মার্চ মাসে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। উড়ালসেতুটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। তারপরও সে এলাকায় যানজটের কোনো উন্নতি নেই। ৮ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মগবাজার-মৌচাক উড়ালসেতুটিতে ২০১৭ সালের অক্টোবর যান চলাচল শুরু করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সবাই ভেবেছিল হয়তো এটি হলে মানুষের দুর্ভোগ কমে আসবে। কিন্তু এখনো সেখানে যানজটের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এসব উড়ালসড়ক ছাড়াও মাটির নিচ দিয়ে যানবাহনের সড়ক ও ট্রেন চলার রাস্তাও নির্মিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতো সব মেগা প্রকল্প কোনো কাজে আসবে না কারণ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর ব্যক্তিগত গাড়ি কমিয়ে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাছাড়া যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনকে আলাদা করা জরুরি। বিপুলসংখ্যক মানুষ, সড়কের অনুপাতে ব্যক্তিগত যানবাহন বেশি হওয়া এবং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ঢাকাকে যানজটের নগরীতে পরিণত করেছে। ঢাকার ভেতরেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে নষ্ট হচ্ছে মানুষের মূল্যবান সময়। এ জন্যই ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির শহর।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য মতে, ঢাকাতে খুব বেশি যানজট ও দুর্ভোগ হয় এমন ১৫টি এলাকাকে যানজটের হটস্পট (কেন্দ্র) হিসেবে গণ্য করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে কুড়িল বিশ্বরোড, বাড্ডা, রামপুরা, মহাখালী বাসটার্মিনাল এলাকা, পল্টন, গুলিস্তান, সদরঘাট, শাহবাগ, বাংলামোটর, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব ও মিরপুর-১০ গোলচত্বর। মূলত এসব এলাকাতেই অধিকাংশ বড় ধরনের প্রকল্পগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও জনদুর্ভোগ ও যানজটের সমস্যা দূর হয়নি। দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, যানবাহনের অনুপাতে রাস্তা খুবই কম রয়েছে। উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করলেও কাজে আসবে না, যদি না পরিবহনের সক্ষমতা না থাকে। এক্ষেত্রে প্রধান কাজ হলো ছোট বাহন কমিয়ে গণপরিবহন বাড়াতে হবে। সবাইকে গণপরিবহনের দিকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। বড় প্রকল্প করে সুফল পাওয়া যাবে না সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে। যানজটের সমস্যা নিরসনে পরিবহনের দিকে নজর দিতে হবে। ঢাকার রাস্তার সক্ষমতা যতটুকু তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গাড়ি চলছে। গণপরিবহনের সমস্যা ও যানজটের কারণে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। সরকার যদিও বলেছে গণপরিবহন ও ফুটপাতে অর্থ ব্যয় করবে কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। রাজধানীজুড়ে মানসম্মত বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করতে পারলে যানজটের সমস্যা নিরসন সম্ভব। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির ফলে ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত কমিউনিটি ট্রেনের লাইনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বড় প্রকল্প না করে ঢাকার পরিবহনকে ঢেলে সাজানো জরুরি। ঢাকার মতো শহরের জন্য টানেলের মতো প্রকল্প একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। এখানের অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে এটি সামঞ্জস্য হয় না।