ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

দেশে ভ্রূণ হত্যা বাড়ছে

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া

ডিসেম্বর ৮, ২০২৩, ১১:৫৮ পিএম

দেশে ভ্রূণ হত্যা বাড়ছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের একজন অধ্যাপকের কাছে পরামর্শ নিতে এসেছেন আসমা আক্তার (ছদ্মনাম)। তার চোখেমুখে বিষণ্নতার ছাপ। হাতে কয়েকটি কাগজ নিয়ে প্রবেশ করেন চিকিৎসকের কক্ষে। ডাক্তারের কক্ষ থেকে বের হয়েই মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। কান্নার কারণ জানতে চায় আমার সংবাদ। সাথে থাকা আসমা আক্তারের মা শুরুতে জানাতে না চাইলেও সাংবাদিক পরিচয় দেয়ায় উভয়েই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একটি ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে তার মেয়ের, ওই সম্পর্কের বয়স তিন বছর। এরই মধ্যে বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে ওই ছেলে। তার মেয়ে এখন সন্তানসম্ভবা। কিন্তু বিয়েতে রাজি নয় ছেলে। যে কারণে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে পিতৃপরিচয়হীন অনাগত সন্তানকে বাধ্য হয়েই পৃথিবীর আলো দেখাতে চান না তারা। গর্ভপাতের মাধ্যমেই বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসক নিষেধ করেছেন। বলেছেন, ছেলে ও মেয়ের সম্পর্ক পারিবারিকভাবে মেনে নিতে। 

দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন পলাশ ও তিশা (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে এসে পরিবারকে না জানিয়ে দুজন বিয়েও করেন। দুজনের টিউশনির পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সরকারি চাকরির। এ সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তিশার গর্ভে আসে সন্তান। কিন্তু এ সন্তানের ব্যয়ভার বহন করার মতো অবস্থা নেই তাদের। তারা এ সন্তানকে আর বড় করতে চান না। গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন। 

রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক (ছদ্মনাম)। তার ২০ বছরের দাম্পত্য জীবনে রয়েছে চার মেয়ে। তার স্ত্রী আবারও সন্তানসম্ভবা। তার চাওয়া একটি ছেলেসন্তান। কিন্তু এবারও তার গর্ভে এসেছে কন্যা সন্তান। তিনি স্ত্রীর গর্ভপাত করাতে চান। কিন্তু তার স্ত্রীকে কোনোভাবেই রাজি করাতে পারছেন না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই বাগ্বিতণ্ডা হয়। মোজাম্মেল হকের সাথে কথা হয় আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমার চারটি মেয়ে। একটা ছেলেসন্তান প্রয়োজন। তার বিশ্বাস, ছেলেসন্তান না হলে তার সম্পদ অর্থ-বিত্ত ও উত্তরাধিকার হারিয়ে যাবে। বংশ রক্ষায় তার ছেলেসন্তান প্রয়োজন। 

একইভাবে অসংখ্য অগণিত ভ্রূণ হত্যার মহোৎসব চলছে দেশে। যার সাক্ষী কেবল গাইনি চিকিৎসক, নার্স ও দেশের উপজেলা-জেলাসহ ঢাকার হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো। দেশের প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো মূলত এ ভ্রূণ হত্যায় এগিয়ে। আমার সংবাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, পরিবার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান, কয়েকটি ক্লিনিকে গর্ভপাত করতে যারা আসছেন তাদের মধ্যে ১৬ বছরের কিশোরী থেকে মধ্য বয়স্ক নারীও রয়েছেন। বিয়ের আগে অনেকেই অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের কারণে গর্ভবতী হওয়ায় বাধ্য হয়ে গর্ভপাত করেছেন। দেশে গর্ভপাতের চারটি পদ্ধতি রয়েছে— প্রথমটি ভ্যাকুয়াম পদ্ধতি, দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গর্ভ কেটে ফেলা হয়, তৃতীয় পদ্ধতির নাম সার্জিক্যাল, সর্বশেষ লবণ পদ্ধতি। বাংলাদেশে ভ্যাকুয়াম পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বর্তমানে গর্ভপাত করাতে যারা আসছেন, তাদের মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীর সংখ্যা বেশি। লোকলজ্জার ভয়ে তারা গোপনে বিভিন্ন ক্লিনিকে গিয়ে গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করতে আসেন।’ বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ নিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা। রাজধানীর আনাচে-কানাচে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন ক্লিনিক মালিকরা নারীদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মোটা অংকের টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছেন। রাজধানীর বিভিন্ন ক্লিনিক ঘুরে জানা যায়, শুধু ঢাকাতেই দৈনিক দুই শতাধিক অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গর্ভপাত করতে গিয়ে যেসব নারী স্বামীকে উপস্থিত করতে পারছেন না বা যাদের স্বামী নেই তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চুক্তিতে গর্ভপাত করছে প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো। গর্ভপাত ঘটানোর সময় মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটলেই কেবল তা নজরে আসে। তা ছাড়া শত শত ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। অথচ গর্ভপাতে দেশে রয়েছে কঠোর আইন। কিন্তু সামাজিক কারণে ভ্রূণ হত্যার মামলা করতে চান না অনেকেই। আবার প্রায়ই গণমাধ্যমে শিরোনাম হয় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক, ভ্রূণ হত্যা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে মামলা। আবার স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর ভ্রূণ হত্যার মামলাও সচরাচর গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়। 

ভ্রূণ হত্যা মামলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনের দণ্ডবিধির ১৮৬০ এর ৩১২ ধারায় বলা আছে, কোনো নারী গর্ভপাত ঘটালে তিন বছরের সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। আবার ১৮৬০-এর ৩১৩-তেও বলা আছে, নারীর অনুমতি নিয়ে যিনি গর্ভপাত ঘটাবেন তার শাস্তি যাবজ্জীবন অথবা ১০ বছরের জেল আর ১৮৬০-এর ৩১৪ ধারায় বলা আছে, অনুমতি ছাড়া গর্ভপাত করা হলে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। প্রচলিত আইনে অনেকের বিচারও হচ্ছে। তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অভাব কিংবা সামাজিক কারণে এ সংক্রান্ত বেশির ভাগ মামলারই সমাধান হচ্ছে সমঝোতায়। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ও গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শিখা গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভ্রূণ হত্যা শব্দটি আমি ব্যবহারই করতে চাই না। গর্ভপাতের আধুনিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত অনেক পদ্ধতি রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ একটি দাম্পত্য জীবনের সিদ্ধান্ত। আমাদের কাছে অনেক রোগী আসেন, যাদের অনাকাঙ্ক্ষিক গর্ভধারণ হয়েছে। গর্ভপাত কোনোভাবেই কাম্য নয়। সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ভেবে আমরা পরামর্শ দিয়ে থাকি। আমরা চাই সুন্দর জীবন। মানুষ যেন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘সমাজ যখন পরিবর্তিত হয় তখন সমাজের কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আসে। আমরা যদি আমাদের সমাজে দেখি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে যখন আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে যায় তখন মানুষের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন ঘটে। আধুনিকতার সাথে মানুষের উন্মুক্ত সম্পর্কের বিষয়টিও চলে আসে। একটা সময় আমাদের এখানে ভ্রূণ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু আমরা এখন দেখছি এটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। আমাদের এখানে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আমরা এটিকে আধুনিকতার কুফল বলতে পারি। আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানুষের কাছে এটি এখনো ভয়ানক অপরাধ। ভ্রূণ হত্যা রোধে যে আইনগুলো আছে সেগুলো আমাদের প্রচলিত সমাজের উপর নির্ভর করেই তৈরি করা। আমাদের এখানে ভ্রূণ হত্যা বিষয়ে মানুষের জনমত দেখা উচিত। জনমতের ভিত্তিতে ভ্রূণ হত্যা বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’ 

এদিকে গর্ভপাতের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘গর্ভপাত বলতে সন্তান প্রসবের আগে, সাধারণত গর্ভধারণের প্রথম ২৮ সপ্তাহের মধ্যে, জরায়ু থেকে ভ্রূণের অপসারণ ও বিনষ্টকরণকে বোঝায়।’ চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত এমআরের (মিন্সট্রুয়াল রেগুলেশন) মাধ্যমে গর্ভপাত করানো হয়। কিন্তু ১২ সাপ্তাহ পর আর কোনোভাবেই গর্ভপাত বলা যাবে না। কিন্তু ১২ সপ্তাহ পর থেকে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতকেও দেশে এমআর বলে চালিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। বিশ্বজুড়েই গর্ভপাতের পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তিবাদীরা নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি উপস্থাপন করছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ ও বিভিন্ন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি সরাসরি শিশুহত্যা। কেননা, ভ্রূণ মানেই হচ্ছে শিশুর আকার।

অন্যদিকে গর্ভপাতের পক্ষে যারা তারা বলছেন, ভ্রূণহত্যা মানেই শিশুহত্যা নয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে ভ্রূণ যদি মানবের পুরোপুরি আকারে রূপান্তর না হয় তাহলে তা শিশুহত্যা হতে পারে না। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গর্ভপাত নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। ধর্মীয়ভাবে গর্ভপাত নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার নারীর সম্মানের কথা ভেবে গর্ভপাত করানো হয়। এর সঙ্গে সামপ্রতিক যোগ হয়েছে পুত্রসন্তানকাঙ্ক্ষীদের মনোভাব-যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে গর্ভস্থ কন্যা ভ্রূণকে হত্যা করা হয় গর্ভপাতের ?মাধ্যমে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলফ সার্ভের প্রতিবেদন বলছে, দেশে বছরে গর্ভধারণের সংখ্যা ৪০ থেকে ৪২ লাখ। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৪ লাখ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ। 

অপর দিকে, আমেরিকার প্রজনন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যান্ড গুট মাকার ইনস্টিটিউটের  প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে বছরে ছয় লাখ ঝুঁকিপূর্ণ এমআর করানো হয়। যার মধ্যে এক লাখের বেশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। আর গর্ভজাত জটিলতায় মারা যাচ্ছেন পাঁচ সহস্রাধিক নারী।
 

Link copied!