ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দুর্যোগে মানুষের শেষ ভরসা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

রুহেল হাশেমী

রুহেল হাশেমী

নভেম্বর ৮, ২০২৫, ০৪:৩১ পিএম

দুর্যোগে মানুষের শেষ ভরসা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

আগুন, দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-যেখানেই মানুষের জীবন হুমকির মুখে, সেখানেই পৌঁছে যায় একদল সাহসী মানুষ। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন বাঁচায়, আগুন নেভায়, ধসে পড়া ভবন থেকে মানুষ উদ্ধার করে এবং দুর্ঘটনাস্থলে প্রথম চিকিৎসা দেয়। তারা হলো দেশের গর্ব-ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে ফায়ার সার্ভিস: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর দেশের জরুরি উদ্ধার ও অগ্নি–নির্বাপণ কার্যক্রমে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। এই মহান প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, যিনি দক্ষতা, সাহস ও মানবিকতার সমন্বয়ে অধিদপ্তরকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর দিকনির্দেশনায় পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ফায়ার ফাইটাররা দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছেন জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায়।

আগুন লাগা, ভবন ধস, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সবক্ষেত্রেই এই বাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামনের সারিতে কাজ করে যান। তাদের ত্যাগ ও আত্মনিবেদন দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদ কামালের নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস আধুনিক প্রশিক্ষণ, দ্রুত সাড়া দেওয়া ইউনিট ও উন্নত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সেবার মান আরও উন্নত করছে।

দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বাহিনীই আজ প্রকৃত অর্থে জনগণের রক্ষাকবচ।

বাঙালির জীবনে ফায়ার সার্ভিস নামটি শুধু একটি সরকারি সংস্থার নাম নয়, বরং এটি একটি আস্থার প্রতীক। আগুন লাগলে প্রথমেই মানুষ যে নম্বরে ফোন করে, সেটিই ফায়ার সার্ভিস।

প্রতিষ্ঠা ও লক্ষ্য: বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর বাণিজ্যিক ও সামাজিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এটি মূলত গৃহ, শিল্প, যানবাহন ও জনসমাগমস্থলে অগ্নি নির্বাপণ, উদ্ধার অভিযান এবং জরুরি সেবা প্রদানে নিয়োজিত।

প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো জনগণের জীবন, সম্পদ ও পরিবেশকে আগুন ও দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করা। পাশাপাশি, যুদ্ধকালীন বা অন্যান্য জাতীয় জরুরি অবস্থায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করাও এর অন্যতম দায়িত্ব।

প্রধান কাজ ও কার্যক্রম

অগ্নি নির্বাপণ: ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আগুন নেভানো। বাড়ি, কারখানা, দোকান, বাজার, গুদাম কিংবা অফিস—যেখানেই আগুন লাগে, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ শিল্প এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই ফায়ার ফাইটাররা জীবন বাজি রেখে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন, যাতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।

তাদের কাজ শুধু আগুন নেভানো নয়, বরং আগুনের উৎস শনাক্ত করা, ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর উপায় নির্ধারণ করাও তাদের দায়িত্বের অংশ।

উদ্ধার অভিযান: আগুনের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান ফায়ার সার্ভিসের আরেকটি বড় ভূমিকা। ভবন ধস, সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যা, নৌকা ডুবি কিংবা শিল্প দুর্ঘটনা-যে কোনো দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তারা।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড, তুরাগ নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনা, সড়কে বাস উল্টে যাওয়া বা পাহাড় ধস, এসব ঘটনার পর প্রথমেই মাঠে নামে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার দল।

তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত সদস্যদের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করে। অনেক সময় এ অভিযান কয়েক ঘণ্টা নয়, টানা কয়েকদিন পর্যন্ত চলে।

প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবা: অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনার পর আহতদের তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানও ফায়ার সার্ভিসের অন্যতম কাজ। তারা আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

অধিদপ্তরের প্রতিটি ইউনিটে এখন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত সদস্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। এছাড়া বড় ধরনের দুর্ঘটনায় চিকিৎসা সহায়তা দল (Medical Response Unit) গঠন করা হয়।

সিভিল ডিফেন্স ও জাতীয় সহায়তা: ফায়ার সার্ভিসের নামেই আছে “সিভিল ডিফেন্স-অর্থাৎ বেসামরিক প্রতিরক্ষা। যুদ্ধ, দুর্যোগ বা অন্যান্য জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় জনগণকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি মনোবল বৃদ্ধির কাজ করে এই সংস্থা।

প্রয়োজনে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা, উদ্ধার সরঞ্জাম বিতরণ, এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে তারা।

বিশেষ করে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় ফায়ার সার্ভিসের স্বেচ্ছাসেবীরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধই ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। তারা ভবন, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও শপিং মলগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে থাকে। যেসব ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, তাদের সতর্ক করা হয় এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এছাড়া বিভিন্ন দপ্তর ও বিদ্যালয়ে ফায়ার ড্রিল (Fire Drill) পরিচালনা করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ আগুন লাগলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা জানে।

রোগী পরিবহন ও মানবিক সেবা: প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্স ইউনিট আহত বা অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করে থাকে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা ঘটলে বা রাস্তায় গাড়ি না পেলে এই সেবা অনেকের জন্য জীবনরক্ষাকারী হয়ে ওঠে। অধিদপ্তরের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সারাদেশে ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

অফিসার ও ফায়ার ফাইটারদের কাজের পরিধি

অফিসারদের কাজ: অফিসাররা প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত দায়িত্ব পালন করেন। তারা অধীনস্থ ফায়ার স্টেশনগুলোর ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন এবং নীতিমালা বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান করেন। অগ্নিপ্রতিরোধমূলক প্রচারণা, ভবন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, এবং জরুরি পরিকল্পনা প্রণয়নেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ফায়ার ফাইটারদের কাজ: ফায়ার ফাইটাররা হলেন এই বাহিনীর প্রাণ। তারা সরাসরি আগুনের মুখে দাঁড়িয়ে নির্বাপণ করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ঢুকে মানুষ উদ্ধার করেন, এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রবেশ করে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেন।

তাদের প্রতিটি অভিযানে থাকে জীবন-মৃত্যুর লড়াই, তবে তবুও তারা থেমে যান না। ফায়ার ফাইটারদের জন্য শারীরিক ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অপরিহার্য।

আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি সংযোজন

ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ড্রোন ক্যামেরা, স্মার্ট রেসকিউ টুলস, থার্মাল ইমেজিং ডিভাইস, জল কামান (Water Cannon) ও হাইড্রোলিক কাটিং মেশিন-সবকিছুই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আধুনিক রেসকিউ ও রিসার্চ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও, প্রতিটি জেলায় ধীরে ধীরে নতুন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।

প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের সহযোগিতায় আধুনিক উদ্ধার কৌশল ও অগ্নিনির্বাপণ দক্ষতা অর্জনের কর্মসূচি চলছে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স একাডেমিতে (মিরপুর, ঢাকা) প্রতি বছর শত শত কর্মকর্তা ও ফায়ার ফাইটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ: ফায়ার সার্ভিস একা সব দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে না-জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প এলাকায় অগ্নি প্রতিরোধ সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালায়।

আগুন লাগলে কী করবো? এই সহজ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমেই প্রতিদিন অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব সম্ভব হচ্ছে। 

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা: যদিও ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম প্রশংসনীয়, তবু অবকাঠামো ও জনবল ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের দ্রুত নগরায়ন, বহুতল ভবন বৃদ্ধি এবং অপর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা অনেক সময় কাজকে কঠিন করে তোলে। তবুও সাহস, প্রযুক্তি ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে ফায়ার সার্ভিস আগামী দিনে আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে-এমনটাই আশা জাতির।

আগুন হোক বা বন্যা-যখন সবাই পিছু হটে, তখনই এগিয়ে আসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। তাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও পেশাদারিত্বই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ।

জাতির জীবনে এই বাহিনীর অবদান অমূল্য, এবং তাদের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সর্বোচ্চ মানবিকতা।

জেএইচআর

Link copied!