তানজিদ সরওয়ার
নভেম্বর ১০, ২০২৫, ১২:০১ এএম
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে আলোচিত ও সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রায় ১৯ লাখ ১০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিল্প-বাণিজ্যকেন্দ্রিক অঞ্চলে টানা বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করা কোনো সহজ কাজ নয়, তবুও ডিপিডিসি সেই চ্যালেঞ্জকে সামলাচ্ছে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে ডিপিডিসির ভূমিকা
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, যা বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাওয়ার বিভাগের অধীনে পরিচালিত। ২০০৮ সালে ডিপিডিসি গঠিত হয় পূর্বতন ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথরিটির (ডেসা) পুনর্গঠন থেকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ও নারায়ণগঞ্জ জেলার কিছু অংশে বিদ্যুৎ বিতরণ পরিচালনা করে। এই এলাকার বিদ্যুৎ চাহিদা প্রতিদিন গড়ে ১৭০০ থেকে ১৮০০ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবা : স্মার্ট মিটার থেকে ডিজিটাল বিলিং
ডিপিডিসি এখন শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দাতা এক আধুনিক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্মার্ট মিটারিং সিস্টেম চালু করেছে, যার ফলে গ্রাহকরা নিজেরা ব্যবহার মনিটর করতে পারছেন, বিল হিসাবের স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ চুরি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
ডিপিডিসির চেয়ারম্যান এবং বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজের তত্ত্বাবধানে ডিপিডিসি গ্রহণ করেছে নানা উদ্ভাবনী কর্মসূচি। স্মার্ট গ্রিড, প্রিপেইড মিটার, অনলাইন বিলিং ও দ্রুত ত্রুটি সমাধান সেবা চালুর মাধ্যমে নাগরিক জীবনে এসেছে স্বস্তি। রাজধানীর মানুষের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর আহমদের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সেবা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জনে ডিপিডিসি এখন দেশের অন্যতম অগ্রগামী সংস্থা হিসেবে পরিচিত।
রাজধানীর বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারে জনসচেতনতা তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে স্বচ্ছতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ডিপিডিসি এগিয়ে যাচ্ছে একটি স্মার্ট ও টেকসই বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দিকে, যেখানে নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণই তাদের মূল লক্ষ্য।
“আমরা এখন ‘স্মার্ট পাওয়ার সিটি’ গড়ার পথে। প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার চালুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে, যাতে গ্রাহক নিজের ব্যবহারে আরও সচেতন হতে পারেন। এছাড়া বিল পরিশোধ এখন শতভাগ অনলাইন নির্ভর। গ্রাহকরা বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতে পারেন, যা সেবার গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছে।”
লোড ব্যবস্থাপনায় আধুনিক কন্ট্রোল সেন্টার
ডিপিডিসির অন্যতম বড় অর্জন হলো লোড ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (Load Dispatch Center) প্রতিষ্ঠা। এই সেন্টারের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে শহরের বিভিন্ন উপকেন্দ্রের (substation) বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একজন কর্মকর্তা জানান, ‘আগে কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে কারণ জানতে সময় লাগত, এখন তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত করে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে।’ এই প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এখন রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
গ্রাহকসেবায় নতুন উদ্যোগ
ডিপিডিসি গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের জন্য ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, ই-মেইল ও মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে। ‘ডিপিডিসি সার্ভিস’ নামের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা নতুন সংযোগ আবেদন, বিল দেখা ও সমস্যা রিপোর্ট করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর আহমদ জানান, ‘আমরা চাই গ্রাহক যেন বিদ্যুতসেবাকে ব্যাংকিং সেবার মতো নির্ভরযোগ্য মনে করেন। অভিযোগ সমাধানে এখন ‘ট্র্যাকিং সিস্টেম’ রয়েছে, যেখানে প্রতিটি অভিযোগের অগ্রগতি দেখা যায়।
বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুৎ চুরি। ডিপিডিসি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব অনিয়ম রোধ করছে।
২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ডিপিডিসির অভিযানে ১,৯০০টি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং প্রায় কয়েক কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, ‘অবৈধ সংযোগ বন্ধের মাধ্যমে শুধুমাত্র রাজস্ব আয় বাড়েনি, বরং বৈধ গ্রাহকরা এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।’
পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ
ডিপিডিসি এখন কার্বন নির্গমন কমাতে সোলার পাওয়ার ও গ্রিন এনার্জি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অফিস ভবন, উপকেন্দ্র এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ চলছে।
কোম্পানির এক পরিচালক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ডিপিডিসির অন্তত ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা। এছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ডিপিডিসি ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।’
অবকাঠামো উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ
যদিও প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রাজধানীর পুরনো এলাকাগুলোর ভূগর্ভস্থ তার ব্যবস্থাপনা, হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ— এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি প্রতিষ্ঠানটি। একজন ইঞ্জিনিয়ার যিনি ডিপিডিসির প্রকৌশল শাখায় কর্মরত, তিনি বলেন, ‘পুরনো ঢাকার নিচে তার, গ্যাস, পানি ও ড্রেনেজ লাইন একসাথে চলেছে, এ অবস্থায় ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপন অত্যন্ত জটিল। তবে আমরা ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করছি।’
প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে নিউ ইস্কাটন, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ ও নারায়ণগঞ্জ শহর এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল প্রকল্প শুরু করেছে। এর মাধ্যমে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ডিপিডিসির চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঢাকা পাওয়ার সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (উচঝওচ). স্মার্ট গ্রিড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, ইলেকট্রিক ভেহিকল চার্জিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট, সাবস্টেশন অটোমেশন ও লোড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।
২০২৬ সালের মধ্যে ডিপিডিসি রাজধানীর সব বিদ্যুৎ সংযোগ ১০০% স্মার্ট মিটারে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে। এছাড়া গ্রাহকসংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য নতুন ৪০টি সাবস্টেশন নির্মাণ কাজ চলছে।
নাগরিক প্রত্যাশা ও সমালোচনা
রাজধানীর বাসিন্দারা ডিপিডিসির আধুনিক সেবাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও কিছু অভিযোগ রয়ে গেছে, বিশেষ করে ট্রান্সফরমার ত্রুটি বা লাইন মেরামতে বিলম্ব নিয়ে। মতিঝিলের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল আগে অনেক সময় ভুল হতো, এখন তা প্রায় ঠিক আছে। তবে কোনো এলাকায় ট্রান্সফরমার নষ্ট হলে সমাধান পেতে দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগে।’ এ বিষয়ে ডিপিডিসি জানায়, তারা জরুরি রেসপন্স টিম গঠন করেছে, যারা অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন মানে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য
বিদ্যুৎ এখন শুধু আলো নয়, এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির প্রাণশক্তি। রাজধানীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ মানে হাজারো ব্যবসা, অফিস, স্কুল ও হাসপাতালের কার্যক্রম সচল থাকা। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ডিপিডিসি প্রতিটি পদক্ষেপে প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও দায়বদ্ধতা যুক্ত করছে।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাজ শুধু বিদ্যুৎ দেয়া নয়, বরং প্রতিটি পরিবার ও ব্যবসা যেন নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারে, সেটাই আমাদের দায়িত্ব। রাজধানীর অর্থনীতি যেমন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। তবুও ডিপিডিসি ক্রমেই নিজেকে আধুনিক, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, স্মার্ট গ্রিড ও নবায়নযোগ্য শক্তির সমন্বয়ে ডিপিডিসি এখন বাংলাদেশের শহুরে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার এক আধুনিক উদাহরণ। রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা— এই অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায়।