তানজিদ সরওয়ার
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
বাংলাদেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের গতি আজ উল্কার মতো। একদিকে বাড়ছে সিএনজি ও এলপিজি চালিত যানবাহনের সংখ্যা, অন্যদিকে দ্রুত গড়ে উঠছে বড় বড় শিল্প কারখানা। কিন্তু এ উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে মিশে আছে এক ভয়াবহ ঝুঁকি, দাহ্য পদার্থ ও বিস্ফোরক দ্রব্যের ব্যবস্থাপনা। সামান্য একটি অবহেলা যেকোনো মুহূর্তে একটি জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। এ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাগাম টেনে ধরে জননিরাপত্তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর (ডিপার্টমেন্ট অব এক্সপ্লোসিভস)।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি ১৮৮৪ সালের ঐতিহাসিক বিস্ফোরক আইনের (এক্সপ্লোসিভস অ্যাক্ট, ১৮৮৪) মূল চেতনের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাংলাদেশের নিরাপত্তা বলয় সুদৃঢ় করে যাচ্ছে। বর্তমানে এ অধিদপ্তরের সারথি হিসেবে সাহসিকতার সাথে কাজ করছেন প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বলিষ্ঠ দিকনির্দেশনায় বিস্ফোরক অধিদপ্তর এখন কেবল একটি দাপ্তরিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দুর্গম থেকে আধুনিক নিরাপত্তা অভিযানে এক চৌকস সম্মুখ যোদ্ধার নাম।
১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত বিস্ফোরক আইন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাজের পরিধি ও গুরুত্ব বেড়েছে বহুগুণ। এটি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যা বাণিজ্যিক বিস্ফোরক, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি), অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং অন্যান্য দাহ্য পদার্থের আমদানি, মজুত, পরিবহন ও ব্যবহারের সার্বিক লাইসেন্সিং ও নিরাপত্তা তদারকি করে থাকে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর মূলত নিরাপত্তার চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। দেশের হাজার হাজার পেট্রোল পাম্প, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশনের নতুন লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন প্রক্রিয়া এখন পুরোপুরি ডিজিটাল। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমেছে। দাহ্য পদার্থ মজুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তা মান (স্ট্যান্ডার্ড স্পেসিফিকেশনস) বজায় আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও ঝটিকা পরিদর্শন পরিচালনা করে এ দপ্তর।
দেশের উচ্চচাপের গ্যাস পাইপলাইন এবং হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল অক্সিজেন মজুতের জন্য ব্যবহৃত বড় আকারের স্টোরেজ ট্যাংকের নিরাপত্তা অনুমোদন দান করে অধিদপ্তর। করোনাকালীন অক্সিজেন সংকটের সময় এ দপ্তরের ভূমিকা ছিল জীবনরক্ষাকারী। বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটলে তার পেছনের রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করে এ দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা। তাদের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ইতিহাসে বর্তমান সময়টি একটি আমূল পরিবর্তনের কাল। এর মূলে রয়েছে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শকের বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্ব।
কর্মকর্তাদের ভাষায়, তিনি একজন প্রকৃত ফিল্ড লিডার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরে বসে ফাইল স্বাক্ষর করার চেয়ে তিনি ঝুঁকি যেখানে, সেখানে উপস্থিত থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। তার নির্দেশনায় অধিদপ্তরের অফিসাররা এখন অনেক বেশি তৎপর। ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তিনি দুর্নীতির পথ বন্ধ করেছেন এবং সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে সাধারণের নাগালের ভেতর এনেছেন। তার নেতৃত্বে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দাহ্য পদার্থের গুদাম এবং নিয়মবহির্ভূত এলপিজি ব্যবসার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক স্যার আমাদের একটি মন্ত্র শিখিয়েছেন, একটি ছোট অবহেলা মানেই একটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়। তাই ঝুঁকি নিতে হলেও আমরা পেছপা হই না। তার সাহসিকতা আমাদের প্রতিটি অভিযানে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাজ আর সাধারণ সিভিল সার্ভিসের কাজ এক নয়। এখানে অফিসারদের কাজ করতে হয় বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। যখন বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটে এবং সাধারণ মানুষ প্রাণভয়ে দূরে সরে যায়, ঠিক তখনই এ দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা সেই উত্তপ্ত ধ্বংসস্তূপের ভেতর ঢুকে পড়েন। আগুনের লেলিহান শিখার মাঝেও তারা খুঁজে চলেন মূল উৎস, কেন ঘটল এ বিস্ফোরণ? কীভাবে রোধ করা যেত এ প্রাণহানি?
সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপো থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার রাসায়নিক গুদাম, প্রতিটি অভিযানে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শকের নেতৃত্বে এ সম্মুখ যোদ্ধাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। গত এক বছরে অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধভাবে স্থাপিত হাজার হাজার দাহ্য স্থাপনা পরিদর্শন করেছে এবং জনস্বার্থে সেগুলো সিলগালা বা উচ্ছেদ করেছে।
২০২৬ সালের এ সময়ে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তর এখন নজর দিচ্ছে স্মার্ট সিকিউরিটির দিকে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্মার্ট গ্রিড পাইপলাইন মনিটরিং বা সেন্সরের মাধ্যমে গ্যাস লিকেজ তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ।
অত্যন্ত বিপজ্জনক গুদাম বা ট্যাংকের ভেতরে মানুষের পরিবর্তে ড্রোন বা রোবট পাঠিয়ে পরীক্ষা করার জন্য রোবোটিক ইন্সপেকশন। মো. আবুল হাসান মনে করেন, আইন প্রয়োগের চেয়ে সচেতনতা তৈরি করা বেশি কার্যকর। তাই ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়ম মেনে ব্যবসা করার মানসিকতা তৈরিতেও কাজ করে যাচ্ছে এ দপ্তর।
একটি আধুনিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার পেছনে প্রচারবিমুখ এ সম্মুখ যোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এর সুযোগ্য দিকনির্দেশনায় এবং মো. আবুল হাসানের মতো সাহসী নেতৃত্বের অধীনে থাকা দক্ষ অফিসারদের নিরলস পরিশ্রমই আমাদের প্রতিদিনের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তর কেবল একটি সরকারি দপ্তর নয়, এটি বারুদের বিরুদ্ধে মানুষের সুরক্ষার এক অজেয় দুর্গ। যখন আপনি আপনার সিএনজি চালিত গাড়িতে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরেন কিংবা যখন দেশের হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ সচল থাকে, জানবেন তার পেছনে কাজ করছে কোনো একজন বিস্ফোরক পরিদর্শকের নিপুণ তদারকি।
এ দপ্তরের প্রতিটি সদস্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন কেবল একটিই লক্ষ্য নিয়ে, একটি নিরাপদ এবং অগ্নিঝুঁকিমুক্ত বাংলাদেশ। প্রচারবিমুখ এ যোদ্ধাদের সাহসিক পথচলা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অনুপ্রেরণার। বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যারা নিরাপত্তার জাল বুনে যান, তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।