ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্চ ১৪, ২০২৬, ০১:১৯ এএম

ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ভোজ্যতেল, বিশেষ করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি এটি প্রকৃত সংকট নয়, বরং একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। রমজানকে সামনে রেখে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ার সময়েই ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের শক্ত তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজন হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জরুরি।

রাজধানীর বাজারে তেলের বোতল উধাও

শুক্রবার রাজধানীর সূত্রাপুর, শ্যামবাজার, ধূপখোলামাঠ, রায়সাহেব বাজার ও নয়াবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দোকানেই পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল নেই। কোথাও এক লিটার বা দুই লিটারের বোতল থাকলেও তা খুব সীমিত।

অনেক দোকানে বোতলজাত তেল না থাকায় বিকল্প হিসেবে ক্যানোলা তেল বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু ক্যানোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে কম পরিমাণে তেল কিনছেন।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, বড় কোম্পানির ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা অনেক সময় ফোন ধরছেন না। কেউ কেউ আবার জানাচ্ছেন, তাদের কাছেও তেল নেই। ফলে অনেক দোকানদার বাধ্য হয়ে পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনছেন।

“ডিলারদের কাছে তেল নেই”

সূত্রাপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. ফারুক হোসেন বলেন, আগের মতো কোম্পানিগুলো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলাররা বলছে মিল থেকে তেল পাচ্ছে না। ফলে আমাদের কাছেও পর্যাপ্ত মাল আসছে না।

তিনি জানান, বর্তমানে তার দোকানে এক ও দুই লিটারের কিছু বোতল থাকলেও পাঁচ লিটারের বোতল নেই। অথচ সবচেয়ে বেশি চাহিদা এই বড় বোতলের।

তার ভাষায়, “এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়। অনেকদিন ধরেই ধীরে ধীরে এই সংকট তৈরি হচ্ছে। যদি সরকার মিলারদের কাছে কত তেল আছে তার সঠিক হিসাব নেয় এবং সরবরাহ বাড়াতে চাপ দেয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।”

সীমিত সরবরাহে বিক্রি : ধূপখোলা বাজারের ব্যবসায়ী শহিদুল্লাহ বলেন, কোম্পানিগুলো আগের মতো তেল দিচ্ছে না। যেটুকু আসে তা খুব কম। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি না। তিনি বলেন, এখন অনেক ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে ক্যানোলা তেল কিনতে হচ্ছে। যদিও এর দাম বেশি, কিন্তু সয়াবিন তেল না থাকায় মানুষ বিকল্প হিসেবে তা নিচ্ছেন।

পাইকারি বাজারেও চাপ : শ্যামবাজারের একটি দোকানের ম্যানেজার জানান, ডিলারদের কাছে মাল থাকলে তারা দেন, না থাকলে দেন না। রূপচাঁদা, তীর বা অন্যান্য বড় ব্র্যান্ডের তেল গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই অনিয়মিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, খোলা সয়াবিন তেলের দাম বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ২০৫ টাকা। পাম তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৭০ টাকা কেজি। আর বোতলজাত সয়াবিন তেলের এক লিটার প্রায় ১৯৫ টাকা এবং দুই লিটার প্রায়৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের ভোগান্তি

নয়াবাজারে তেল কিনতে আসা আমিরুল ইসলাম বলেন, তিনি কয়েকদিন ধরে পাঁচ লিটারের বোতল খুঁজছেন। “চারদিন ধরে বাজারে ঘুরে আজকে একটি বোতল পেয়েছি। ছোট বোতল কিনলে খরচ বেশি পড়ে। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটা বড় সমস্যা।” তার অভিযোগ, বাজারে ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করা হয়েছে।

“যুদ্ধের প্রভাব এত দ্রুত আসার কথা নয়”

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা বলা হলেও অনেক সময় ব্যবসায়ীরা অজুহাত হিসেবে এসব বিষয় ব্যবহার করেন। “যদি কোথাও যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার প্রভাব এত দ্রুত বাজারে পড়ার কথা নয়। অনেক সময় সিন্ডিকেট করে পণ্য মজুত রাখা হয়, পরে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য।”

রমজান এলেই কেন সংকট?

আরেক ক্রেতা তুষার মোল্লা বলেন, রমজান এলেই বাজারে নিত্যপণ্যের সংকট তৈরি হওয়া বাংলাদেশের একটি পুরানো সমস্যা। তার মতে, উন্নত দেশগুলোতে রমজান বা বড় উৎসবের সময় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো হয়, কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক উল্টোটা ঘটে। “সরকারের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নেয় বলে তার অভিমত।

আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব : অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু বাজার কারসাজি নয়, আমদানি সংকোচনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশ বর্তমানে “ইমপোর্ট কমেপ্রশন” বা আমদানি সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, গত কয়েক বছরে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের আমদানি কমে গেছে। এতে বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “২০২২ সালের তুলনায় এখনও আমদানির পরিমাণ সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

সরবরাহ বাড়ানোই মূল সমাধান : ড. রাজ্জাকের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ এখন সরবরাহ ঘাটতি। তিনি বলেন, “যেহেতু স্থানীয় উৎপাদন কম, তাই আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ থাকায় আমদানি সহজ হচ্ছে না।” তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং স্বল্পমেয়াদে পর্যাপ্ত আমদানি নিশ্চিত করাই একমাত্র টেকসই সমাধান।

মজুদ আছে, তবুও সংকট কেন?

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, হিসাব অনুযায়ী বাজারে তেলের ঘাটতি থাকার কথা নয়। তার দাবি, গত বছরের তুলনায় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি মজুদ রয়েছে।

তিনি বলেন, “যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে ভোক্তাদের কষ্ট দেয়, তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।”

তার মতে, যদি কোনো মিল মালিক বা ব্যবসায়ী অনৈতিকভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ক্যাবের দাবি: কৃত্রিম সংকট

ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া মনে করেন, বাজারে প্রকৃত কোনো সংকট নেই। তার দাবি, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশের চাহিদা অনুযায়ী তেলের সরবরাহ রয়েছে। রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর কাছেও পর্যাপ্ত মজুদ আছে।”

তদারকি বাড়ানোর দাবি

ক্যাবের মতে, বাজার তদারকি দুর্বল হওয়ায় এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সংগঠনটির দাবি, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। হুমায়ুন কবীর বলেন, “শুধু ছোট জরিমানা করে লাভ নেই। প্রয়োজন হলে বড় অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”

সরকারের বক্তব্য

বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ভোজ্যতেলের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে পর্যাপ্ত তেল মজুদ রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। মন্ত্রী আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

অভিযান চলবে

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যদি কোথাও অতিরিক্ত দাম নেওয়া বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘমেয়াদে কী করা দরকার?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোজ্যতেল বাজারের এই ধরনের সংকট বারবার তৈরি হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো আমদানিনির্ভরতা। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ডলার সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দেশের বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল।

তাদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট এড়াতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সর্বোপরি, বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়লেও সরকার ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। তবে বাস্তবে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট এবং সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করা এবং কঠোর নজরদারি চালানো না হলে এ ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও দেখা দিতে পারে। রমজানের মতো সময়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।

Link copied!