নিজস্ব প্রতিবেদক
এপ্রিল ২০, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম
দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায়। বিশেষ করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জনপ্রিয় মাধ্যম রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেলে ভাড়া এক লাফে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস গতকাল রোববার সকালে অফিসগামী যাত্রীদের গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ, যা নিয়ে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ।
আকাশছোঁয়া ভাড়া, দিশেহারা যাত্রী : গতকাল শনিবার রাতে সরকারের পক্ষ থেকে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪৬ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন এই দাম কার্যকর হওয়ার পর গতকাল সকালে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে রাইডশেয়ারিং অ্যাপের চেয়ে চুক্তিতে চলাচলের প্রবণতা এবং বাড়তি ভাড়া নেয়ার চিত্র দেখা গেছে। বেসরকারি চাকরিজীবী ফারহানা নীলা জানান, মিরপুরের ইসিবি চত্বর থেকে গুলশান-২ আসতে আগে যেখানে ১০০ টাকা লাগত, আজ সেখানে ১৪০ টাকা দিতে হয়েছে। একইভাবে বছিলা থেকে গুলশানে আসা জাফর ইকবাল জানান, গতকাল যে পথে ১৮৭ টাকা ভাড়া ছিল, আজ সকালে অ্যাপেই তা ২৪০ টাকা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে ৫৩ টাকা।
চালকদের যুক্তি- ‘তেল পাওয়াই দুষ্কর’ : ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে মোটরসাইকেল চালকদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, কেবল তেলের দামই বাড়েনি, পাম্পগুলোতে তেল পাওয়াও এখন চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গুলশানে আসা চালক মো. মুসা খন্দকার বলেন, ‘গত রাতে সাত ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছি। তেলের দাম বাড়ার ফলে আমাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অ্যাপগুলো যদি দ্রুত ভাড়া সমন্বয় না করে, তবে আমাদের টিকে থাকা অসম্ভব হবে। তাই যাত্রীদের কাছ থেকে কিছু টাকা চেয়ে নিতে হচ্ছে।’
অ্যাপ বনাম চুক্তি, ভাড়া নির্ধারণে বিশৃঙ্খলা : সকাল থেকেই দেখা গেছে অনেক চালক অ্যাপে কল গ্রহণ না করে সরাসরি চুক্তিতে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফার্মগেট থেকে গুলশান আসা যাত্রী নাজহাতুল ত্বোয়া জানান, গতকাল তিনি যে পথ ১৫০ টাকায় পার হয়েছিলেন, আজ তাকে দিতে হয়েছে ২২০ টাকা। অ্যাপে ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে চালকরা ম্যানুয়ালি অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন বলে অভিযোগ সাধারণ যাত্রীদের।
জ্বালানি তেলের নতুন দামের প্রেক্ষাপট : সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কার্যকর হওয়া তেলের দাম অকটেন ১৪০ টাকা (প্রতি লিটার), পেট্রোল ১৩৫ টাকা (প্রতি লিটার), ডিজেল ১১৫ টাকা (প্রতি লিটার), কেরোসিন ১৩০ টাকা (প্রতি লিটার)।
এই আকাশচুম্বী দামের কারণে যারা ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন, তারাও তেলের সংকটে রাইডশেয়ারিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির চালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের শঙ্কা : পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাইডশেয়ারিংয়ে এই অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি কেবল মধ্যবিত্তের যাতায়াত খরচই বাড়াবে না, বরং গণপরিবহনেও এর প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর এই বাড়তি খরচ বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। বিআরটিএ এবং রাইডশেয়ারিং কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত একটি সমন্বিত ভাড়া নীতিমালা ঘোষণা না করলে এই নৈরাজ্য আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।