ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের চ্যালেঞ্জ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুন ১৮, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের চ্যালেঞ্জ

নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে তীব্র অস্বস্তি ও নাভিশ্বাস তৈরি করেছে, তা বর্তমানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাজারের অস্থিরতা যেন এক অদৃশ্য বৃত্তে আটকা পড়েছে, যেখানে সিন্ডিকেটের কারসাজি, সরবরাহ চেইন জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার ভোক্তার পকেট কাটছে। যদিও প্রশাসন মাঝে মাঝেই কঠোর অভিযানের আশ্বাস দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কার্যকর কোনো প্রতিফলন বাজারে খুব একটা দেখা যায় না।

প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ তাদের সীমিত আয়ের সঙ্গে বাজারের পাল্লা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যখন ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতারও ঝুঁকি তৈরি করে। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি ও মনিটরিংয়ের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল পেতে ভোক্তার বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বাজারের এই অস্থিরতাকে শুধু সরবরাহজনিত ঘাটতি বললে ভুল হবে; এর পেছনে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল নেটওয়ার্ক এবং খুচরা পর্যায়ে যথাযথ তদারকির অভাব।

বাজার নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের জন্য একটি ‘অগ্নিপরীক্ষা’। উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ বা খাদ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখা যে কোনো সরকারের সক্ষমতার প্রধান মাপকাঠি। একদিকে মুদ্রাস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের দাপট এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ এখন একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অপেক্ষায়। স্বল্পমেয়াদি অভিযান বা মৌখিক সতর্কবার্তার পরিবর্তে বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থাগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপরই নির্ভর করছে জনজীবনের স্বস্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এক ধাক্কায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। এটি কেবল একটি সাধারণ সংখ্যা নয়, এটি গত ১৬ মাসের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ড। এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশের উচ্চ ঘরে পৌঁছেছিল, যা অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছিল। মাঝের কয়েক মাস কিছুটা ওঠানামা করলেও মে মাসের এই তীব্র লাফ নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করে তুলেছে।

সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি থাকে এবং তা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু বর্তমানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (৯.৭১%) খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো মানুষের জীবনযাত্রার সংকট শুধু চাল-ডাল বা কাঁচাবাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, গণপরিবহন, জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা এবং সন্তানদের স্কুল-কলেজের বেতন ও খাতার খরচের মতো মৌলিক ও অপরিহার্য সেবাগুলোর খরচও সমান তালে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

অর্থনীতির সাধারণ তত্ত্বে মনে করা হয় যে, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় জীবনযাত্রার খরচ কিছুটা কম এবং সেখানে খাদ্য উৎপাদন সরাসরি হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কম থাকে। তবে বিবিএসের মে মাসের উপাত্ত এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। বর্তমানে শহরের তুলনায় দেশের গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ অনেক বেশি দৃশ্যমান এবং তীব্র। গ্রামের প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষ এখন শহরের চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে (৯.৮৫%)। এর মূল কারণ গ্রামীণ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব, সেচ কাজে ব্যবহূত ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়া এবং গ্রামীণ চিকিৎসাব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি। গ্রামের প্রান্তিক মানুষের আয় শহরের তুলনায় অনেক কম এবং অনিয়মিত হওয়ায় এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি গ্রামীণ সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে এক চরম ও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতির এই ক্রমাগত ও অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতির ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও পরিবারগুলোতে যে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সংকটটি তৈরি হয়েছে, তা হলো মানুষের প্রকৃত মজুরি বা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়া। কোনো দেশের অর্থনীতি তখনই টেকসই হয় যখন মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি বা সমান থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় পর্যায়ে গড় মজুরি বা নামমাত্র আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর সহজ এবং গাণিতিক অর্থ হলো- মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে ১.২১ শতাংশ কম। ফলে প্রথাগত অর্থে মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক হয়ে গেছে। অর্থাৎ, একজন মানুষ গত বছর যে পরিমাণ টাকা আয় করে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে পারতেন, চলতি বছর আয়ের অঙ্ক বাড়লেও তিনি আগের চেয়ে অনেক কম পণ্য ও সেবা ঘরে তুলতে পারছেন।

নতুন সরকারের কাছে দেশের আপামর জনগণের অন্যতম প্রধান ও প্রথম প্রত্যাশা ছিল যে কোনো উপায়ে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনে একটু স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। সরকার এই লক্ষ্যে বেশ কিছু ভালো ও প্রশংসনীয় উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি বাড়ানো, খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খুচরা বাজারে নিয়মিত তদারকি করা।

পরিশেষে বলা যায়, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য কেবল একটি অর্থনৈতিক বা গাণিতিক হিসাব মেলানোর বিষয় নয়; বরং এটি বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও সবচেয়ে বড় এবং কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির অন্য যে কোনো সূচক যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা রপ্তানি বৃদ্ধির চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান সূচক হলো বাজারের নিত্যপণ্যের দাম। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়া এবং ধারের ঋণের বোঝা মানুষের সহনশীলতার সীমাকে অতিক্রম করছে।

এই অবস্থায় বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা দূর করা এবং সিন্ডিকেটের শক্ত হাত ভেঙে দেয়াই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সরকার যদি কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জিরো টলারেন্স নীতি এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সঠিক ও সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই কেবল বাজারে স্থায়িত্ব ফিরে আসবে এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে বলে সংশিষ্টরা মত দিয়েছেন।

Link copied!