নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ১৫, ২০২৬, ১২:২৩ এএম
একটি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান চালিকাশক্তি হলো পুলিশ বাহিনী। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিংবা যে কোনো জাতীয় সংকটে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা নিরলস দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু যে পুলিশ বাহিনী অন্য সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তাদের নিজেদের যাপনচিত্র কতটা মানবিক ও স্বাস্থ্যকর- তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিগত দেড় দশকে দেশের পুলিশ বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি তাদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা ‘আবাসন সুবিধা’। ফলে তীব্র আবাসন ও বাসস্থান সংকটের মুখে দাঁড়িয়েই অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে এই বাহিনীকে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করে কেবল পদ সৃষ্টি ও লোকবল বাড়ানোর ফলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেশের পুলিশ বাহিনীর আবাসন সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। কিন্তু চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল বাহিনীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশের মতো সদস্য সরকারি আবাসন বা কোয়ার্টার সুবিধা পাচ্ছেন। বাকি ৯০ শতাংশ পুলিশ সদস্যকেই সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চড়া দামে ভাড়া বাসায় থেকে কিংবা মেসে গাদাগাদি করে বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
বিগত ২০১০ সালে বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার। বিগত ১৬ বছরে দফায় দফায় ব্যাপক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করার কারণে ২০২৬ সালে এসে এই সংখ্যা আড়াই লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, দেড় দশকের ব্যবধানে বাহিনীটিতে লোকবল বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার। কোনো কোনো বছরে দুইবারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
লোকবল বৃদ্ধির পাশাপাশি এই সময়ে পুলিশের কাজের পরিধি বাড়াতে নতুন ছয়টি বিশেষায়িত ইউনিট সৃষ্টি করা হয়েছে। ইউনিটগুলো হলো— ১. পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২. ট্যুরিস্ট পুলিশ ৩. নৌ-পুলিশ ৪. অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ৫. বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ৬. ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) কিন্তু এই নতুন ইউনিট ও লাখের ওপর বর্ধিত জনবলের বিপরীতে নতুন কোনো বড় আবাসন প্রকল্প বা ব্যারাক সুবিধা গড়ে না তোলায় আবাসন সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজারের মতো কনস্টেবল রয়েছেন, যা মোট বাহিনীর বেশিরভাগ। মূলত এই কনস্টেবলরাই সরাসরি মাঠপর্যায়ে, রাস্তায়, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কিংবা অপরাধ দমনে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কেউ কেউ সরাসরি থানায় যুক্ত থাকেন, আবার কেউ রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ১ লাখ ৭৩ হাজার কনস্টেবলের জন্য সরকারি আবাসন সুবিধা নেই বললেই চলে। স্বল্প বেতনের এই বেশিরভাগ সদস্যকে রাজপথে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে অত্যন্ত নিম্নমানের মেস বা অস্বাস্থ্যকর ব্যারাকে রাত কাটাতে হয়, যা সরাসরি তাদের পেশাদারিত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রাজধানী ঢাকায় পুলিশের আবাসনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কোয়ার্টার ও ব্যারাক থাকলেও তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় সমুদ্রের মাঝে একবিন্দু জলের মতো। ঢাকায় পুলিশের প্রধান আবাসন স্পটগুলো হলো— মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টার ও তিনতলা অফিসার্স কোয়ার্টার্স: এখানে সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্য সপরিবারে থাকার সুযোগ পান। নীলক্ষেতের ১৫ তলা ভবন: এখানে ৬০০ বর্গফুটের ছোট ফ্ল্যাটে পরিদর্শক (ইন্স্পেক্টর) ও উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তারা থাকেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স: এখানে সাতটি ব্যারাক রয়েছে, যেখানে পরিদর্শকসহ কনস্টেবলরা থাকেন। এছাড়া রাজারবাগ হাসপাতালের পাশে ‘মধুমিতা’ নামে একটি ১৬ তলা অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে, যা বর্তমানে ২০ তলায় উন্নীত করার কাজ চলছে (এটির ফ্ল্যাটগুলো ১,১০০ বর্গফুটের)। এর পাশে পাঁচতলা ‘তিতাস’ কোয়ার্টার এবং পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নামে আরও তিনটি চার-পাঁচ তলাবিশিষ্ট অফিসার্স কোয়ার্টার রয়েছে। অন্যান্য: ইস্কাটন ও ডেমরায় অফিসার্স কোয়ার্টার এবং উত্তরা এলাকায় এসপিবিএনসহ কয়েকটি ইউনিটের জন্য বেশ কয়েকটি কোয়ার্টার করা হয়েছে।
কাগজে-কলমে এই আবাসনগুলোর নাম থাকলেও বাস্তব চিত্র অত্যন্ত করুণ। ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যদের আবাসন ব্যবস্থা সীমিত তো বটেই, তার ওপর তা চরম অস্বাস্থ্যকর। ডিএমপির প্রটেকশন অ্যান্ড প্রটোকল বিভাগের সদস্যদের আবাসনের জন্য দুটি ভবন বরাদ্দ দেয়া আছে, যার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা মাত্র ১,০৫১ জন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে থাকতে হচ্ছে প্রটেকশন বিভাগের ২ হাজার ১২২ জনকে! অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ সেখানে থাকছেন। এর ওপর আবার যুক্ত হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের কিছু সদস্য।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় এই দুই হাজারের বেশি সদস্যের থাকার জায়গা হচ্ছে না। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, অনেক সদস্যকে ভবনের সিঁড়ির নিচের ফাঁকা জায়গায় বিছানা পেতে ঘুমাতে হচ্ছে। সেখানেও যখন জায়গা মিলছে না, তখন বাধ্য হয়ে অনেক পুলিশ সদস্যকে ভবনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙিয়ে যাযাবরের মতো অবস্থান করতে হচ্ছে। দীর্ঘ ডিউটি শেষে এসে এমন অমানবিক পরিবেশে বিশ্রাম নিতে হওয়ায় মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে। একটি স্বাস্থ্যকর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য চিকিৎসা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে জনপ্রতি ১০০ থেকে ৪০০ বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এটি কিছুটা কমবেশি হলেও তা কোনো অবস্থাতেই ৭০ বর্গফুটের কম হওয়া উচিত নয়। কিন্তু পুলিশের ব্যারাকগুলোতে জনপ্রতি এই ন্যূনতম জায়গাটুকুও মিলছে না।
পুলিশের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আবাসন সংকট ও মাঠপর্যায়ের অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকার করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সার্বিক পরিস্থিতি ও সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ পুলিশের আবাসন সংকট একটি দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা, এটি আমরা অস্বীকার করছি না। বিগত বছরগুলোতে সদস্য সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সেই গতিতে আবাসন পরিকাঠামো বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু মেগা আবাসন প্রকল্প এবং বহুতল বিশিষ্ট ব্যারাক নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা নেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারও পুলিশের এই আবাসন সংকট নিরসনে অত্যন্ত আন্তরিক। আশা করা যায়, চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে এই সংকটের তীব্রতা অনেকটাই কমে আসবে।’
পুলিশের কাছ থেকে পেশাদার, মানবিক ও উন্নত সেবা পেতে হলে সবার আগে তাদের স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ ডিউটির পর একজন পুলিশ সদস্য যদি রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে না পারেন, সিঁড়ির নিচে বা খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে রাত কাটাতে হয়, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের দৈনিক কাজের ওপর। কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা কাগুজে শক্তি বাড়াতে লোকবল নিয়োগের চিরাচরিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।