বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার জট খুলেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ড কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক 'হিট জব'।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম বাপ্পির সরাসরি নির্দেশে এবং পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ১৭ জনের বিরুদ্ধে দাখিল করা চার্জশিটে প্রধান শুটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ফয়সাল করিম মাসুদকে।
ডিবির তদন্ত অনুযায়ী, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে শরিফ ওসমান হাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করতেন। তার বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করলে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ের চক্ষুশূলে পরিণত হন। ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত সরকারবিরোধী কণ্ঠ রোধ করতেই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম বাপ্পি এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বাপ্পি তার অনুগত ক্যাডারদের নিয়ে একাধিক গোপন বৈঠক করেন। সেই বৈঠক থেকেই ফয়সাল করিম মাসুদকে চূড়ান্তভাবে শুটার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফয়সালকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, হত্যাকাণ্ডের পর তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে। ঘটনার দিন কাউন্সিলরের সরাসরি সিগন্যাল পাওয়ার পর ফয়সাল হাদির ওপর অতর্কিত গুলি চালায়, যা ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।
তদন্ত সংস্থা মোট ১৭ জনকে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে চার্জশিটে অভিযুক্ত করেছে। তাদের মধ্যে ডিবির অভিযানে ইতোমধ্যে এই চক্রের ১১ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে বিভিন্ন মেয়াদে জেল হাজতে রয়েছেন। তবে চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামিদের মধ্যে ৬ জন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তারা হলেন, ফয়সাল করিম মাসুদ (মূল শুটার), তাজুল ইসলাম বাপ্পি (পরিকল্পনাকারী কাউন্সিলর), আলমগীর, ফিলিপ, জেসমিন ও মুক্তি।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম ব্রিফিংয়ে বলেন, এটি একটি ঠান্ডা মাথার খুন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে একজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। আমরা অভিযুক্তদের জবানবন্দি ও ডিজিটাল এভিডেন্স বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছি যে, ফয়সালই ট্রিগার চেপেছিলেন এবং নেপথ্যে ছিলেন বাপ্পি। পলাতক ৬ জনকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা তাও করব।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, পলাতক আসামিরা সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে শুটার ফয়সাল এবং কাউন্সিলর বাপ্পি ঘটনার পরপরই এলাকা ত্যাগ করেন। তাদের গ্রেপ্তারে দেশের সকল বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে চার্জশিট দাখিলকে স্বাগত জানানো হলেও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, হাদি কেবল একজন মুখপাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন সত্যের কণ্ঠস্বর। আমরা চাই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার শুনানি হোক।
মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার ভিকটিম ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম বাপ্পি এবং প্রধান শুটার ছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ।
ডিএমপির ডিবি কর্তৃক তদন্ত করা এই মামলায় মোট ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। রাজধানীর বুকে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করে হত্যার এই ঘটনাটি দেশের মানবাধিকার এবং বাক-স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।
চার্জশিট জমা দেওয়ার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলো। এখন দেখার বিষয়, আদালত পলাতক আসামিদের হাজির করতে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
ইএইচ