চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার ফাটাপাড়া এখন এক জনশূন্য ও আতঙ্কের জনপদ। গত শনিবারের সেই ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের রেশ কাটেনি আজও। বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও তিনজন।
তবে এই প্রাণহানির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর পরবর্তী সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। আজ সোমবার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্ফোরণস্থল ফাটাপাড়ার অধিকাংশ বাড়ি এখন পুরুষশূন্য। গ্রেফতার আতঙ্ক আর প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েকশ মানুষ, যাদের অধিকাংশই নিরীহ কৃষক।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে চূড়ান্তভাবে ঘায়েল করার লক্ষ্যেই একদল লোক ভাড়া করে এই শক্তিশালী বোমাগুলো তৈরি করা হচ্ছিল। যে বাড়িতে বিস্ফোরণটি ঘটেছিল, সেটি স্থানীয় বাসিন্দা কালামের।
গত শনিবার বোমা তৈরির সময় হঠাৎ একসঙ্গে অনেকগুলো বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল, ইটের তৈরি শক্ত দেয়াল ধসে পড়েছে এবং ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে দূরে আছাড় খেয়েছে। ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
আজ সকালে ফাটাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক ভুতুড়ে পরিবেশ। যে কালামের বাড়িতে বোমা তৈরি হচ্ছিল, তাঁর বংশের প্রায় ১০০ জন লোক এখন এলাকাছাড়া। স্থানীয়রা জানান, পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই দিনমজুর বা সাধারণ কৃষক।
তাদের বোরো ধানের জমিগুলো এখন পানিশূন্য পড়ে আছে। বালুমাটির এই এলাকায় প্রতিদিন সেচ দিতে হয়। কিন্তু লোকবলের অভাবে কৃষিকাজ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নয়, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে ওই বংশের সাধারণ মানুষগুলো।
ঘটনার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কালামের ভাই দুলালের নাম। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, দুলালের নির্দেশেই ভাড়াটে কারিগর দিয়ে এই মরণঘাতী বোমাগুলো বানানো হচ্ছিল।
কয়েক বছর আগেও দুলাল আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হন। দুলালকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন স্থানীয়রা। তিনি এলাকায় মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত এবং চার হত্যা মামলার আসামি পলাতক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদ রানা ওরফে টিপুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
তিনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি দল পরিবর্তন করে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। পলাতক চেয়ারম্যান টিপুর অনুপস্থিতিতে ওই এলাকায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, জাহান্নামের পথ ছেড়ে জান্নাতের পথে আসা দুলাল এখন নিজেই তো জাহান্নামের পথে গেলেন।
তাঁর উচ্চাশার কারণে তাঁর নিরীহ ভাই কালামসহ পুরো বংশের জীবন এখন বিষিয়ে উঠেছে। শ’খানেক মানুষ এখন ঘরছাড়া এবং জমিগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, দুলালের পরিকল্পনা ছিল এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালানো।
সেই হামলার প্রস্তুতি হিসেবেই এই বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত করা হয়েছিল। বিস্ফোরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে স্থানীয় সোনাপট্টি গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে গত বৃহস্পতিবারের ঘটনার কথা।
ভোটের দিন রাতে জামায়াতের বিজয় মিছিল থেকে ফাটাপাড়ায় বিএনপির ইউনিয়ন সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নাসির উদ্দিনের বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টাধাওয়া হয়। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ওই সংঘর্ষের পর বিএনপির লোকজনকে শায়েস্তা করার জন্য দুলাল একটি বিশেষ দল তৈরি করেন।
প্রতিশোধ নিতেই বোমা তৈরির কারিগর ভাড়া করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিস্ফোরণের আগে সারারাত ধরে ব্যাগে করে বোমাগুলো বিভিন্ন ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল। একটি ব্যাগ সরাতেই অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণটি ঘটে থাকতে পারে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং সদর থানার তদন্ত পরিদর্শক সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ ঘটনার গুরুত্ব নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এলাকাটি বর্তমানে থমথমে থাকলেও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা এবং প্রতিপক্ষকে সশরীরে ঘায়েল করার জন্যই বোমাগুলো তৈরি হচ্ছিল।
ব্যাগে রাখা অনেকগুলো বোমা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ায় এর ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক। আমরা ঘটনার মূল হোতা দুলালসহ জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনা প্রমাণ করে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার লিপ্সা সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
নির্বাচনের পর যখন সারা দেশে উৎসবের আমেজ, তখন ফাটাপাড়ার কৃষকরা ফসলের জমি ছেড়ে ফেরারী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি এই নিরীহ মানুষগুলো কবে ঘরে ফিরতে পারবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।
জেএইচআর