বরিশাল প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। তবে এই স্বাধীনতার সমান্তরালে থাকতে হবে স্বচ্ছ জবাবদিহি। আজ শনিবার মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এসব কথা বলেন।
একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকতা হতে হবে ভয়ভীতিহীন এবং পেশাদার। গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের চেয়ে নিজস্ব নীতিমালার ওপরই গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সংবাদকর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাধীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সাংবাদিকতা পেশায় কোনো সংকট বা বিরোধ তৈরি হলে তা ওই পেশার নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই সমাধান হওয়া কাম্য।
‘গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অযাচিত হস্তক্ষেপ আমরা চাই না। কারণ হস্তক্ষেপ মানেই হলো পেশাগত স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা। আমরা একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে গণমাধ্যম ও সরকার—উভয়ই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদল নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সোপান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং সম্মানের সাথে বেঁচে থাকা। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সত্তর দশকের নির্বাচনের পর গঠিত সরকার মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। সেই অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতির কারণেই পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ এক নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে বর্তমানের এই সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তারেক রহমানের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শীর্ষক রাষ্ট্র সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
কেবল রাজনীতি নয়, জহির উদ্দিন স্বপন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সংস্কার নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীদের পেছনে ফেলে কোনো জাতি প্রকৃত উন্নয়ন করতে পারে না।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে চলতি মাস থেকেই সারাদেশে 'ফ্যামিলি কার্ড' বিতরণ শুরু হবে। দেশের প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের কাছে পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে।
শিক্ষিত বেকার তৈরির রাষ্ট্রকে একটি ‘ব্যর্থ সমাজ’ হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী বলেন, দ্রুততম সময়ে একটি পরিকল্পিত ‘কর্মসংস্থান ম্যাপিং’ তৈরি করা হবে। প্রতিটি শিক্ষিত তরুণের জন্য উপযুক্ত কর্ম নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসনের উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে।
প্রশাসনকে তার নিজস্ব স্বকীয়তায় কাজ করতে দিতে হবে। কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো বরদাশত করা হবে না।
দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আন্দোলন করা কোনো পেশা হতে পারে না। সমাজ আমাদের আন্দোলন করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনের অহংকার যেন আমাদের অশোভন বা গণবিরোধী আচরণ করতে উৎসাহিত না করে। পুরোনো চিন্তা মগজ থেকে ঝেড়ে ফেলুন।’
মন্ত্রী হুশিয়ারি দেন যে, ভবিষ্যতে যেন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও মানুষকে রাস্তায় নামতে না হয়, সেই শিক্ষাই ইতিহাস থেকে নিতে হবে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মো. মঞ্জুর মোর্শেদ আলম, পুলিশ সুপার ফারজানা ইসলাম এবং সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী।
আলোচনা শেষে মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এএন