নুরুল আমিন, খুলনা
জুন ১৭, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আওতায় দেশব্যাপী পরিচালিত চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারি, ২০২৪-এর খুলনা বিভাগীয় প্রতিবেদন প্রকাশ ও এ বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার বিকালে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলনকক্ষে এই সেমিনারটির আয়োজন করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন বলেন, অর্থনৈতিক শুমারি যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরাসরি সহায়তা করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এবারের অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে যে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু খামতির কথাও তিনি তুলে ধরেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল ধারায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং অগ্রগতি এখনও আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও ব্যবসায়িক অংশগ্রহণের পরিধি বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও সমন্বিত কাজ করার তাগিদ দেন তিনি। এ ছাড়া, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এখন সারা বিশ্বেই সেবাখাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি শক্তিশালী সেবাখাত গড়ে তুলতে হলে সবার আগে প্রয়োজন দক্ষ, শিক্ষিত ও মেধাবী মানবসম্পদ। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে হলে এই মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
খুলনা বিভাগীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের যুগ্মপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল আলীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম এবং রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মো. সাজাদুর রহমান রাসেল। সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে অত্যন্ত তথ্যবহুল বক্তব্য উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিনের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. উত্তম কুমার মজুমদার।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে শুমারির কারিগরি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানানো হয়, ‘সময়ের বিবর্তনে দেশের কৃষি বহির্ভূত অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রস্তুত’ এই মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক ২০২৪ সালে এই শুমারি পরিচালিত হয়। এবারের শুমারিতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিএপিআই এবং জিআইএস ম্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রবন্ধে দেশের অর্থনৈতিক শুমারির ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রথম অর্থনৈতিক শুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। এরপর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শুমারি দুই পর্যায়ে ২০০১ ও ২০০৩ সালে এবং তৃতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে দেশের চতুর্থ তথা সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এবারের শুমারিতে সারা দেশে মোট ৮৭,৪১৯টি গণনা এলাকা গঠন করা হয়েছিল এবং প্রতিটি এলাকায় আনুমানিক ১৫০টি করে অর্থনৈতিক ইউনিট অন্তর্ভুক্ত করে ডেটা সংগ্রহ করা হয়।
সেমিনারে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০১৩ সালের শুমারিতে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল ৭৮,১৮,৫৬৫টি, যা ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৭,০২,৭৯২টিতে। অর্থাৎ, বিগত এক দশকে জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৪৯.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরদিকে, খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক চিত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে এই বিভাগে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৪৪৫ টি। এর মধ্যে স্থায়ী অর্থনৈতিক ইউনিট ৭ লাখ ৭ হাজার ৬৭৬ টি, অস্থায়ী ইউনিট ৬১ হাজার ৮৬৮ টি এবং অর্থনৈতিক খানা রয়েছে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৯০১ টি।
অথচ, ২০১৩ সালের শুমারিতে খুলনা বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের মোট সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯১ টি। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রধান আলোচক দেখান যে, বিগত এক দশকে খুলনা বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিট বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৯.১২ শতাংশ, যা সামগ্রিক জাতীয় প্রবৃদ্ধির হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এই অঞ্চলের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সচলতার প্রতীক।
উক্ত সেমিনারে খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের কর্মীরা অংশ নেন। উপস্থিত অংশীজনরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এই শুমারির তথ্যকে কাজে লাগিয়ে খুলনা অঞ্চলের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানান।
জেএইচআর