আমার সংবাদ ডেস্ক
জুন ১৭, ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
বিদেশে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান।
বুধবার মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল মাঠে আয়োজিত একটি বিশাল 'ফ্যামিলি কার্ড' বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জনগণের রক্তঘামানো টাকা কোনোভাবেই বিদেশে পাচার হতে দেওয়া হবে না। এই টাকা আর কারো পকেটে যাবে না, বরং দেশের মানুষের কল্যাণ এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিটি পয়সা ব্যয় করা হবে।
বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জনাব তারেক রহমান বলেন, অনেকেই এখন সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা করছেন। তারা প্রশ্ন তুলছেন- আমরা যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (পারিবারিক কার্ড) এবং ‘ফার্লার কার্ড’ (কৃষক কার্ড) দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছি, তার টাকা কোথা থেকে আসবে? আমি তাদের স্পষ্ট বলে দিতে চাই, বিগত একটি সময় ধরে এই দেশের কোটি কোটি মানুষের টাকা অবাধে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমরা সেই পাচার হওয়া ও পাচার হতে যাওয়া জনগণের টাকা শক্ত হাতে আটকে দিয়েছি। আমরা আর কোনোভাবেই এ দেশের মানুষের সম্পদ বাইরে পাচার হতে দেব না।
শ্রীমঙ্গলের এই ঐতিহাসিক জনসভায় উপস্থিত হাজার হাজার চা-শ্রমিক এবং স্থানীয় সাধারণ আপামর জনতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সরকারের এই বৈপ্লবিক ও কল্যাণমুখী উদ্যোগে তারা সাথে আছেন কি না। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্নের জবাবে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হাজার হাজার চা-শ্রমিক এবং সাধারণ নারী-পুরুষ সমস্বরে দুই হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ বলে গগনবিদারী ধ্বনিতে সহমত প্রকাশ করেন।
জনগণের দল বিএনপি, শক্তির উৎস জনতা: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের দল হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সব সময় দেশের আপামর মেহনতি মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এই দেশের সাধারণ জনগণ। অন্য কোনো শক্তির ওপর আমরা ভরসা করি না। এ কারণেই বিএনপি সব সময় জোরালোভাবে বিশ্বাস করে এবং বলে- জনগণই হলো সকল ক্ষমতার উৎস। অতীতে যখনই দেশের মানুষ সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা বিপুল ভোটে বিএনপিকে জয়যুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়েছে।
বক্তব্যের এই পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি বলেন, আমরা অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংকটময় মুহূর্তে দেখেছি, যখনই দেশের মানুষ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য রাজপথে নেমে এসেছে বা দেশ কোনো সংকটে পড়েছে, তখন অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা দেশের মানুষকে বিপদে ফেলে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কখনো দেশের মানুষকে একা ফেলে কোথাও যাননি। তিনি স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের মাটিতেই থেকেছেন এবং বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশই আমার প্রথম ঠিকানা, বাংলাদেশই আমার এবং আমাদের শেষ ঠিকানা।’
প্রধানমন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমরা সবাই বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের সৈনিক। তাই এই প্রিয় বাংলাদেশই আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। আমাদের সামনে এখন একটাই প্রধান কাজ তা হলো বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে নিজেদের এই প্রিয় দেশকে গড়ে তুলি। আমাদের দেশের ২০ কোটি মানুষের মোট ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করতে হবে। দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে। তবেই আমরা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম হবো।
চা-বাগানের মা-বোনদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ: বক্তব্যের শুরুতেই শ্রীমঙ্গলের উপস্থিত বিশাল জনসমুদ্রকে সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনটি আমার জীবনের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং পরম তৃপ্তির একটি দিন। আপনারা কি জানেন কেন? মাত্র কয়েক মাস আগে, যখন আমাদের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছিল, আমি সেই প্রচারণার শুভ সূচনা করেছিলাম সিলেটের পবিত্র পুণ্যभूमि থেকে। আর ঠিক সেই দিনই, সিলেটের সেই জনসভার মঞ্চ থেকে আমি দেশের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলাম যদি মহান আল্লাহর রহমতে এবং আপনাদের ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে, তবে আমাদের চা-বাগানে কর্মরত প্রতিটি মা-বোনকে আমরা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করব।
তিনি আরও বলেন, আজ আমি মহান আল্লাহর দরবারে হাজারো শুকরিয়া জানাই, লাখো শুকরিয়া জানাই যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে সেই পবিত্র প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার সুযোগ ও তৌফিক দিয়েছেন। আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি। আজ আমার সরকার চা-বাগানের সেই অবহেলিত ও কঠোর পরিশ্রমী নারী শ্রমিকদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে পেরেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সময় ঘোষণা দেন যে, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় প্রতিটি চা-বাগানের শতভাগ নারী শ্রমিক এবং বাগানের অন্যান্য সকল যোগ্য পরিবারের কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া সম্পন্ন হবে।
দেশের উন্নয়নে নারীর ক্ষমতায়ন ও আবাসন অনুদান: দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও উন্নয়নকে বেগবান করতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশকে যদি সত্যিকার অর্থে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তবে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাই পুরুষদের পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের নারীদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে না পারি, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।
তিনি বিস্তারিত উল্লেখ করে বলেন, এই কারণেই আমরা নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পারিবারিক কার্ডের ব্যবস্থা চালু করেছি। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি পরিবার রয়েছে। আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলাম, ক্ষমতায় এলে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। বিশেষ করে, পরিবারের নারী প্রধানদের আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এক মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই আমরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই বিশাল প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছি।
বিএনপি সরকার বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু ফ্যামিলি কার্ড দেওয়াই নয়, এর পাশাপাশি আমরা চা-বাগানের গৃহহীন ও সংকটাপন্ন নারী শ্রমিকদের উন্নত আবাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকের জন্য ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা করে অনুদান বরাদ্দ করেছি। আমি আজ এই মঞ্চে প্রতীকী হিসেবে তিন জন সম্মানিত নারী শ্রমিকের হাতে ২ লক্ষ টাকার চেক তুলে দিয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আজকেই বাকি সকল উপকারভোগীদের অ্যাকাউন্টে এই অর্থ সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে, ইনশাল্লাহ।
দেশের সর্বস্তরের মানুষকে কঠোর পরিশ্রম ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই আনন্দের দিনে আমাদের সকলের একমাত্র অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা হবে প্রথমে কাজ। একই সাথে আমি আজ আপনাদের জন্য একটি নতুন স্লোগান দিতে চাই দেশের জন্য কাজ, দেশ সবার আগে, বাংলাদেশ সবার জন্য; কাজ আগে; বাংলাদেশ সবার জন্য, সবার উন্নয়ন।
বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের অন্যান্য কার্যক্রম: বক্তব্যের শেষে পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানস্থলে একটি জাম গাছ এবং একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় পর জনাব তারেক রহমানের শ্রীমঙ্গলে আগমনকে কেন্দ্র করে সমগ্র মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জমকালো সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ুন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস। এছাড়াও উপকারভোগী নারীদের পক্ষ থেকে শিউলি রানী দাস এবং ওয়াজেদা বেগম তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন।
পবিত্র কুরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে প্রথমে জাতীয় সঙ্গীত এবং পরবর্তীতে বিএনপির দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রী স্বশরীরে ১০ জন নারী গৃহপ্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন এবং পরে কম্পিউটারের বোতাম চেপে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি চা-শ্রমিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ২ লক্ষ টাকা করে অনুদান, চা-শ্রমিকদের মেধাবী সন্তানদের জন্য বিশেষ উপবৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করেন।
জেএইচআর