মুছা মল্লিক
জুন ৮, ২০২২, ০৩:০৭ পিএম
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ধামরাই উপজেলার বালিয়া শাখার ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তার ব্যাংকে চাকরি, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সফলতার গল্প শুনিয়েছেন আমার সংবাদকে। তার মুখোমুখি হয়েছিলেন আমার সংবাদের নিজস্ব প্রতিবেদক মুছা মল্লিক।
আমার সংবাদ: আপনার বেড়ে ওঠার গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আমার দুরন্ত শৈশব কেটেছে আমার নিজ গ্রামে। আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা বগুড়ায়। শৈশবে মাছ ধরে ডাংগুলি, গোল্লাছুট, ফুটবল, ক্রিকেট খেলে অবসরে দৌড়ঝাপ করেই ছোটবেলা কেটেছে। তবে পড়াশুনার ব্যাপারে মায়ের ছিল কড়া শাসন। সন্ধ্যার পর বাড়ীর বাহিরে বের হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। প্রথম শ্রেণি থেকেই রোল ১, ২, ৩ এর মধ্যেই থেকেছে। পড়াশোনার হাতে খড়ি গৃহ শিক্ষক রফিকুল ইসলাম স্যারের হাতে। পরবর্তীতে ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও এমফিল ডিগ্রী অর্জন। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি নিয়ে পিএইচডিতে গবেষণারত।
আমার সংবাদ: পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা ছিল কিনা?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: না। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না। আমরা চার ভাই। সবার জন্যই আমাদের বাড়িতে একজন করে গৃহ শিক্ষক থাকতেন। স্যারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ও কড়া অনুশাসনে পড়াশোনা করেছি। আর আমার পড়াশোনার নেপথ্যের কারিগর আমার মা।
আমার সংবাদ: এত পেশা থাকতে ব্যাংকিং পেশা কেন বেছে নিলেন?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: সত্য কথা বলতে কি! আমার চাকুরীজীবী বা ব্যাংকার হওয়ার কোন ইচ্ছাই আমার কখনও ছিলনা। আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল আমি চাকুরী করবো না, বরং আমি নিজে অন্যকে চাকরি দিব। সেজন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় কিছু কাছের বন্ধুদের নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। কিছুদিন ব্যবসা করার পর অনাভিজ্ঞতা ও পূঁজি সংকটের কারণে ব্যবসা হতে আশানুরুপ রিটার্ন পাচ্ছিলাম না। এ দিকে দেশের অন্য দশটা পরিবারের মত আমার পরিবারও সরকারি চাকরি করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। পরিবারের চাপ এবং সামাজিক মর্যাদার কারনে চাকরির পড়াশোনা শুরু করি স্নাতকত্তোর পাশের পর। প্রথমে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা দিয়ে চাকরি জীবনে প্রবেশ করি। পরে ২০১২ সলে গণ মানুষের ব্যাংক বলে খ্যাত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে “সিনিয়র অফিসার” হিসেবে যোগদান করে বর্তমানে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বালিয়া শাখার ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
আমার সংবাদ: পর্দার আড়াল থেকে কেউ অনুপ্রেরণা দিয়েছে? কার কথা বেশী মনে পড়ে?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: অবশ্যই আমার মা-বাবা। আমার জীবনে যতটুকু সফলতা তার মূল কারিগর আমার মা। তিনিই আমাকে সর্বদা সার্বিক সহযোগিতা ও সাহস যুগিয়েছেন। পাশাপাশি আমার প্রতি আমার সুহৃদদের যে প্রত্যাশা, সেটাও আমার জন্য অনুপ্রেরনা হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়াও আমার অগ্রজ তিন ভাই আ. মান্নান,আ. হান্নান, আ. খালেক এবং আমার শিক্ষকমণ্ডলী বিশেষত আব্দুল মান্নান স্যার, রফিক স্যার, আঃ আজিজ স্যার, বাসেত স্যার, রেজাউল স্যার, আতোয়ার স্যার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে আমার মেন্টর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আতাউর রহমান মিয়াজী স্যারসহ সকলের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা। তাদের সকলের অবদান অনস্বীকার্য।
আমার সংবাদ: ব্যাংকার হিসেবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কি? হলে কিভাবে কাটিয়ে উঠেছেন?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: অনেকের ধারণা যে, যারা শুধু বানিজ্য বিভাগ থেকে পড়াশোনা করে তারাই শুধুমাত্র ব্যাংকার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলে। আমাদের দেশে বিসিএসের মত যেকোন বিষয়ের স্নাতকরা ব্যাংকে ক্যারিয়ার গড়তে পারে। তবে একথা ঠিক যে অন্যান্য বিষয়ের স্নাতকদের তুলনায় বানিজ্য বিভাগের স্নাতকরা সহজেই ব্যাংকিংয়ের বিষয়াদি বুঝে উঠতে পারে। আমি কলা অনুষদের শিক্ষার্থী হওয়ায় শুরুতে কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হলেও আমার অভিজ্ঞ সহকর্মীদের সহযোগীতায় ছোট খাট প্রতিবন্ধকতা দ্রুতই কেটে উঠতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য আমার প্রথম কর্মস্থলের সহকর্মী ম্যানেজার, ইনামুল স্যার, উত্তম দাদা, ওলী ভাই এবং বারেক ভাইয়ের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এছাড়া পরবর্তী কর্মস্থলের ফেনীর সাবেক মুখ্য আন্ঞলিক ব্যবস্হাপক,মো. মুস্তাফিজুর রহমান স্যার, শরীয়তপুরের মুখ্য আন্ঞলিক ব্যবস্হাপক (দায়িত্বে)কাজী কামরুজ্জামান স্যার ও প্রধান কার্যালয়ের ভিজিল্যান্স স্কোয়াড বিভাগের বিভাগীয় উপমহাব্যবস্হাপক (দায়িত্বে) শাহ্ মুহাম্মাদ মাঈনুল হাসান স্যারসহ অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ ব্যাংকিং বুঝতে নিরন্তর সহযোগিতা করে চলেছেন। বর্তমানে ঢাকার মূখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক জনাব মুহাম্মাদ রাশিদুল ইসলাম স্যারের সহযোগিতার জন্য স্যারের প্রতি জানাচ্ছি কৃতজ্ঞতা।
আমার সংবাদ: ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার গল্পটা জানতে চাই।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আমি শুরুতেই বলেছি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই আমার ইচ্ছা ছিল না যে, আমি চাকুরী করব তা হোক সরকারী বা বেসরকারি। কিন্ত ব্যবসায়ে অল্প সময়ে সফলতা না পাওয়া এবং পারিবারিক চাপে একটু দেরীতে আমি বিসিএস সহ অন্যান্য চাকুরীর জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। ২০১১ সালে বিকেবির বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করি। ২০১২ সালে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে বিকেবিতে যোগদান করি।
আমার সংবাদ: ভাইবার প্রস্তুতিটা কিভাবে নিয়েছিলেন?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: ভাইবার জন্য নিজ জেলা, অনার্সের বিষয়, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যাবলী এবং সম-সাময়িক ঘটনাবলীর সম্পর্কে ভাল ধারনা থাকলেই ভাল করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে সফল হতে হলে আপনাকে লেগে থাকতে হবে। জীবনে দু' একটা খুচরা সমস্যা আসবেই তাই বলে ভেঙ্গে পড়লে চলবেনা। ভাইবার ক্ষেত্রে আত্নবিশ্বাস সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সুতরাং হতাশ না হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
আমার সংবাদ: সামনের পরিকল্পনা জানতে চাই?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আমার ছাত্র জীবনের সুপ্ত বাসনা বা যে চিন্তা ছিল তা আমি গণ মানুষের বাংলাদেশে কৃষি অর্থায়নে সর্ববৃহৎ বিশেষায়িত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে প্রত্যেক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রান্তিক পর্যায়ে বিস্তৃত ১০৩৮ টি শাখা রয়েছে। তন্মেধ্যে একটি শাখার শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে আমি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছি। আমার শাখার আওতায় ৫টি ইউনিয়নব্যাপী প্রায় ৬০০০ ঋণ গ্রহীতাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করেছে সেক্ষেত্রে বৃহৎ ভূমিকা পালন করছে কৃষকদের অর্থলগ্নীকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বিশেষত শস্য, মৎস্য, প্রাণী সম্পদ খাতে গ্রামীন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরী করছি। যা দেশের কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এক্ষেত্রে আমার কিছুটা ভূমিকা পালন করতে পেরে আমার ভাল লাগছে। দেশ মাটি ও মানুষের জন্য নিজের সেরাটা দিয়ে কাজ করে যেতে চাই।
আমার সংবাদ: নতুন প্রজন্মের যারা ব্যাংকার হতে চান তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আমি মনে করি সৎ উপায়ে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবন যাপন করতে চান তাদের জন্য অবশ্যই ব্যাংকিং ক্যারিয়ার আকর্ষনীয়। কারণ ব্যাংকে বেতনের পাশাপাশি স্বল্প সুদে কোটি টাকার উর্ধ্বে গৃহনির্মান/ফ্ল্যাট ঋণ, মোটর সাইকেল ঋণ, কম্পিউটার ঋণ, মোটরগাড়ী ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ ও লাঞ্চ সাবসিডি সহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধার কারণেএকজন ব্যাংকার স্বল্প সময়ে সৎ উপায়ে বাড়ী-গাড়ীর মালিক হতে পারেন। যে কারনে তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ব্যাংকের চাকুরী।
আমার সংবাদ: নিজের কাছে একজন ব্যাংকার হিসেবে কতটুকু সফল মনে হয়?
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আমি সফল না ব্যর্থ তা আমার সম্মানিত গ্রাহকগণ, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ ভাবে বলতে পারবেন। তবে আমাকে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যখন যে দায়িত্ব দিয়েছে তা সর্বদা নিষ্ঠার সাথে পালন করার চেষ্টা করেছি।
আমার সংবাদ: আমাদের সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। আমার সংবাদের জন্য শুভকামনা।