আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১৮, ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
অবশেষে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
ফ্রান্স সফরে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। প্রাসাদ ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “এটি সই হয়েছে। আমি মাত্রই ভার্সাইতে এটিতে স্বাক্ষর করলাম।” ট্রাম্পের সই করার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ লিখেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভার্সাইয়ে আজ রাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তিতে সই করেছেন।”
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) ইরানের পক্ষ থেকেও তাদের প্রেসিডেন্টের সই করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে জানান, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের’ খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে এবং এখন এটি বাস্তবায়নের সময়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, এই চুক্তিটি ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই হয়েছে। অর্থাৎ, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট দূরবর্তী দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করেই এতে স্বাক্ষর করেছেন।
এর আগে মধ্যস্থতাকারী দেশ সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, আগামী শুক্রবার লুসার্ন হ্রদের একটি বিলাসবহুল হোটেলে দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই চুক্তি সই হবে। তবে সেই আনুষ্ঠানিকতার এক দিন আগেই শীর্ষ দুই নেতা এতে সই করলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, এই চুক্তি এখন থেকেই অবিলম্বে কার্যকর হবে।
গতকাল বুধবার মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের এই ঐতিহাসিক চুক্তির ১৪টি দফা প্রকাশ করা হয়।
চুক্তির প্রধান ১৪টি দফা:
১। এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করবে। কেউ কারও বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ বা শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না।
২। উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।
৩। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাবে। প্রয়োজনে এই সময় আরও বাড়ানো যাবে।
৪। চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে এই অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।
৫। ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় মাইন অপসারণ ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতা দূর করবে।
৬। ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
৭। চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাসহ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
৮। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারিত হবে।
৯। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগপর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না বা সেনা বাড়াবে না।
১০। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি, ব্যাংকিং এবং বিমা খাতের ওপর থেকে বাধা তুলে নেবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
১১। আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের আর্থিক তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
১২। এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি বিশেষ যৌথ কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩। চুক্তির প্রধান ধারাগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর উভয় দেশ বাকি শর্তগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি অনুমোদনের আলোচনা শুরু করবে।
১৪। এই চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, সিএনএন।
জেএইচআর