আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আজ এক ঐতিহাসিক কিন্তু ধোঁয়াশাপূর্ণ কূটনৈতিক মোড় তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, আজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের মধ্যে একটি ফোনালাপ হওয়ার কথা রয়েছে। যদি এই আলোচনা সত্যিই অনুষ্ঠিত হয়, তবে এটি হবে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর দুই প্রতিবেশী দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রথম সরাসরি যোগাযোগ। তবে এই বৈঠক নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, যা অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই আলোচনার সূত্রপাত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের মাধ্যমে। গত বুধবার রাতে (মার্কিন সময়) ট্রাম্প লেখেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটু স্বস্তির পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি। দীর্ঘ সময়, প্রায় ৩৪ বছর পর দুই দেশের নেতারা কথা বলতে যাচ্ছেন। এটা বৃহস্পতিবার ঘটবে। চমৎকার!
ট্রাম্পের এই ‘আকস্মিক’ ঘোষণায় কূটনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে যায়। তবে লেবানন সরকার শুরুতে এই পরিকল্পনার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। বৈরুত থেকে জানানো হয়েছিল, এ ধরণের কোনো বৈঠকের বা আলোচনার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ তাদের জানা নেই। কিন্তু আজ সকালেই ইসরায়েলের একজন মন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবাননের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলবেন।
ইসরায়েল এবং লেবানন প্রযুক্তিগতভাবে দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বা সরাসরি সংলাপ হয়নি। বর্তমানে হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের তীব্র সংঘাত লেবাননকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন মধ্যস্থতায় এই সংলাপ যদি সফল হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমেনি। বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশ্লেষণ এবং স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, দক্ষিণ লেবাননের একের পর এক গ্রাম ও শহর ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী এবং বিমান হামলায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করেছে এবং এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। অর্থাৎ একদিকে আলোচনার টেবিল সাজানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে কামানের গর্জন থামছে না।
লেবানন সংকটের সমান্তরালে পারস্য উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের বন্দরগুলোতে কার্যকর করা নৌ-অবরোধের অংশ হিসেবে গত কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ১০টি জাহাজকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। ইরান যাতে হিজবুল্লাহ বা অন্যান্য মিত্রদের কাছে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করতে না পারে, সেজন্য এই কঠোর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যক্ষ টানাপড়েন পুরো অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রধান ঘটনাসমূহ একনজরে: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী আজই নেতানিয়াহু ও জোসেফ আউনের মধ্যে ফোনালাপ হওয়ার কথা। শুরুতে অস্বীকার করলেও বর্তমানে আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না বৈরুত। বৈরুতসহ দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত। ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর রকেট বর্ষণ। ইরানি বন্দরে প্রবেশের চেষ্টাকালে ১০টি জাহাজ ফিরিয়ে দিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে একটি 'কুইক ডিল' বা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছে। ৩৪ বছর পর দুই দেশের নেতার কথা বলাটা প্রতীকীভাবে অনেক বড় ঘটনা হলেও, মাঠপর্যায়ে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মধ্যকার শত্রুতা এতটাই গভীরে যে, স্রেফ একটি ফোনালাপে শান্তি ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবানন যেভাবে জনশূন্য ও ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রেসিডেন্ট আউনের জন্য ইসরায়েলের সাথে আপস করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আজকের এই দিনটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের পাতায় হয় একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যের দিন হিসেবে লেখা থাকবে, অথবা এটি পরিণত হবে ট্রাম্পের আরেকটি ব্যর্থ আশ্বাসে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
এম জি