আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১৫, ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে হওয়া সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। তবে এই চুক্তি শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলছে না; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার অবস্থানগত পার্থক্যও সামনে এনে দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকাগুলোর একটিতে মঙ্গলবারের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘মুখোমুখি অবস্থান’। তবে সেই শিরোনাম ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে কেন্দ্র করে নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে উদ্ভূত মতপার্থক্যকে ঘিরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করলেও এবার দুই দেশের নেতৃত্ব একই অবস্থানে নেই। বিশেষ করে যুদ্ধ বন্ধ এবং কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে ভিন্ন হয়ে উঠেছে।
চুক্তির আগে পরামর্শ নয়, শুধু অবহিতকরণ
ইসরায়েলি সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে ইসরায়েলকে আগেভাগে অবহিত করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি তেল আবিবে কিছুটা অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগত আলোচনায় নেতানিয়াহুকে ‘জটিল অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই মন্তব্য দুই নেতার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে যে মধ্যপ্রাচ্য নীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়াশিংটন এখন নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে নির্বাচনী বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। এ অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ জনমতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ কমছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত সংঘাত নিরসনের পথ খুঁজছিল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক সমঝোতা ট্রাম্পকে একজন সমস্যা সমাধানকারী নেতা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সমীকরণ ভিন্ন
অন্যদিকে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি করেছে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ওপর। কয়েক মাসের মধ্যে দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত একাধিক মামলাও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন, তবুও ক্ষমতা হারালে আইনি ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের ভাবমূর্তি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ফলে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তিনি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।
যুদ্ধ ও রাজনীতির যোগসূত্র
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিরাপত্তা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অতীতেও দেখা গেছে, জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের সময়ে অনেক নেতা জনসমর্থন বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
এ কারণে বর্তমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে শুধু কূটনৈতিক বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্যও বিষয়টি পুরোপুরি পররাষ্ট্রনীতি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। ফলে দুই নেতার লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ায় একই সংকটকে ঘিরে তাঁদের কৌশলেও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
মিত্রতার সম্পর্ক কি বদলাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান মতপার্থক্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্ক অটুট থাকবে। সামরিক, গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা অনেক গভীর।
তবে ইরান প্রশ্নে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখিয়ে দিয়েছে যে সব বিষয়ে দুই দেশ একমত নয়। বিশেষ করে যুদ্ধের সমাপ্তি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তাদের অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে দ্রুত যুদ্ধের ইতি টানতে চায়, সেখানে নেতানিয়াহু নিরাপত্তা ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই নেতার সম্পর্কের মধ্যে বর্তমান অস্বস্তির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নজর থাকবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, সেদিকেও। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এখনও অন্যতম প্রধান নিয়ামক।
এএন