আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১৭, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির ১৪ দফার একটি গোপন খসড়া প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
ফাঁস হওয়া এই খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গীকারের বিষয় উঠে এসেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা সমঝোতা স্মারকের এই খসড়া কপিটি সংগ্রহ করেছে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই কূটনৈতিক সূত্র এই নথির সত্যতা নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
তবে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বিষয়টি নিয়ে জানিয়েছেন, ফাঁস হওয়া এই নথিটি চূড়ান্ত সমঝোতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত রোববার ডিজিটাল মাধ্যমে এই চুক্তিতে প্রাথমিক স্বাক্ষর করেছেন।
আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এর মূল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং এরপর চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা কার্যকর হবে।
খসড়া অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির বিশেষ অনুমতি দেবে।
পাশাপাশি ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি ঠিকঠাক পূরণ করলে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।
তবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ঠিক কী হবে, তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এই খসড়ায় স্পষ্ট করা নেই।
১৪ দফা চুক্তির মূল শর্তাবলী:
১. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে।
২. সার্বভৌমত্বের সম্মান: উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা: উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
৪. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে নিজের সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধজাহাজ আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে নেবে।
৫. পারস্য উপসাগর উন্মুক্তকরণ: ইরান সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করতে মাইন অপসারণসহ সব প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেবে।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল: যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে আইএইএ ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসহ ইরানের ওপর থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সব ধরনের প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে।
৮. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ: ইরান নতুন করে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মূল সমাধান চূড়ান্ত চুক্তিতে করা হবে।
৯. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা: চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও অঞ্চলে নতুন কোনো সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না।
১০. তেল রপ্তানির অনুমোদন: চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির বিশেষ অনুমোদন দেবে।
১১. আটকে থাকা অর্থ মুক্তি: আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সব স্থাবর-অস্থাবর তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
১২. তদারকি কমিটি: চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি কঠোরভাবে তদারকির জন্য দুই পক্ষের সমন্বয়ে একটি বিশেষ বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩. পরবর্তী আলোচনা: ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার সফল বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির মূল আলোচনা শুরু করবে।
১৪. জাতিসংঘের অনুমোদন: এই চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত হবে।
সূত্র: সিএনএন
এএন