আমার সংবাদ ডেস্ক
মে ১৬, ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ধূমপান ক্যান্সারের কারণ, সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটেই বড় অক্ষরে লেখা থাকে এমন সতর্কবার্তা। কোথাও ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের ভয়াবহ ছবি, কোথাও ফুসফুসের ক্ষয়িষ্ণু চিত্র। তবুও থামছে না ধূমপান। বরং দিন দিন বাড়ছে নতুন ধূমপায়ীর সংখ্যা, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। প্রশ্ন উঠছে, মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও মানুষ কেন সিগারেট হাতে তুলে নিচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধূমপান কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করা এক ধরনের নেশা। প্রথমে কৌতূহল, পরে স্টাইল, এরপর আসক্তি, এই তিন ধাপেই একজন মানুষ ধূমপায়ীতে পরিণত হয়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সময়ে ধূমপান অনেকের কাছে বাহাদুরি বা ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সিনেমা, ধারাবাহিক নাটক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় সিগারেটকে অনেক সময় সাহসী বা আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কিশোর, তরুণরা সহজেই এই প্রভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে খেয়েছিলাম। পরে না খেলেই অস্থির লাগত। এই অস্থিরতাই আসলে নিকোটিনের প্রভাব বলে জানান চিকিৎসকরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, সিগেরেটে থাকা উপাদান খুব দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছে সাময়িক প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে মানুষ মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা হতাশা থেকে মুক্তি পেতে ধূমপানের আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী। কিছুক্ষণ পর আবার সিগারেটের চাহিদা তৈরি হয়। এভাবেই মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ে।
ফুসফুস বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের কারণে শুধু ক্যান্সার নয়, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপসহ অসংখ্য জটিল রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে ফুসফুস ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে ধূমপায়ীর পাশাপাশি তাঁর আশপাশের মানুষও ক্ষতির শিকার হন, যাকে বলা হয় পরোক্ষ ধূমপান।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু সতর্কবার্তা লিখে ধূমপান কমানো সম্ভব নয়। কারণ মানুষ জানে এটি ক্ষতিকর, কিন্তু আসক্তি তাকে বারবার সিগারেটের দিকে টেনে নিয়ে যায়। অনেকেই ধূমপান ছাড়তে চান, কিন্তু পারেন না। এজন্য প্রয়োজন পারিবারিক সহযোগিতা, মানসিক পরামর্শ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, জীবনের চাপ ও হতাশাও ধূমপানের অন্যতম কারণ। চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা সামাজিক প্রতিযোগিতা, এসব কারণে অনেকেই মানসিক স্বস্তি খুঁজতে সিগারেটকে বেছে নেন। তবে বাস্তবে এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
তরুণদের মধ্যে ধূমপান বাড়ার আরেকটি কারণ সহজলভ্যতা। অল্প বয়সীদের কাছেও সহজে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। স্কুল, কলেজের আশপাশেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে তামাকজাত পণ্য।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধূমপান রোধে শুধু আইন নয়, সামাজিক আন্দোলনও জরুরি। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবখানে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের বোঝাতে হবে, ধূমপান কোনো ফ্যাশন নয়, এটি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া এক নীরব বিষ।
অনেক সাবেক ধূমপায়ী জানান, সিগারেট ছাড়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ইচ্ছাশক্তি, পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ধূমপান থেকে দূরে থাকা সম্ভব। কেউ কেউ নিয়মিত ব্যায়াম, বই পড়া বা অন্য ইতিবাচক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে ধূমপান ছেড়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেটের প্যাকেটে সতর্কবার্তা লেখা থাকলেও তা অনেকের কাছে এখন শুধুই নিয়মরক্ষা। কারণ আসক্তির কাছে ভয় অনেক সময় হার মানে। তাই কেবল ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতনতা, মানসিক সহায়তা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই ধূমপান কমানো সম্ভব।
ধূমপান যে বিষপানেরই আরেক নাম, এ কথা সবাই জানে। কিন্তু জেনেও যারা প্রতিদিন সিগারেট ধরাচ্ছেন, তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না, প্রতিটি টান তাদের জীবন থেকে একটু একটু করে সময় কেড়ে নিচ্ছে।
জেএইচআর