রুহেল হাশেমী
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
বাংলাদেশের মেগাসিটি ঢাকার প্রাণস্পন্দন হিসেবে পরিচিত ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা) বর্তমানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে সংস্থাটি কেবল তার নেতৃত্বেই নয়, বরং সেবা প্রদানের দর্শন এবং প্রযুক্তিগত কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের একচ্ছত্র নেতৃত্বের অবসান এবং নতুন পেশাদার নেতৃত্বের আগমনে ওয়াসার প্রতিটি স্তরে এখন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার হাল ধরেছেন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী আব্দুস সালাম ব্যাপারী। গতবছর নভেম্বর মাস থেকে তিন বছরের জন্য এই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। তার এই নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং এটি ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের প্রতি সরকারের আস্থার প্রতিফলন।
ইতিপূর্বে তিনি সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাকে বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনাগুলো অনুধাবনে এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে। এছাড়া হটলাইন নম্বর ১৬১৬২ মাধ্যমে গ্রাহকদের ২৪ ঘন্টা সেবা নিশ্চিত করছে।
ঢাকা ওয়াসার এই ক্রান্তিলগ্নে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ঢাকা ওয়াসাকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “ঢাকা শহরের একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি নিজেও জানি পানির গুরুত্ব কতখানি। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা কেবল ওয়াসার দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি প্রকল্পের তদারকি করব এবং যেখানেই অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা পাওয়া যাবে, সেখানেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২১ সালে ঘোষিত ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ কর্মসূচির যে বীজ বপন করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে তা ‘স্মার্ট ওয়াসা’ প্রোটোকলে ডালপালা মেলেছে।
ঢাকা শহরকে ১৪৫টি ক্লাস্টারে বা ডিস্ট্রিক্ট মিটার এরিয়ায় ভাগ করার যে মহাপ্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের বর্তমান তথ্যমতে, সিস্টেম লস বা অপচয় এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিটি পাম্প স্টেশনে এখন স্মার্ট সেন্সর বসানো হয়েছে, যা সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে যুক্ত। ফলে কোথাও পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বা পাইপে ছিদ্র দেখা দিলে তা তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
এখন আর গ্রাহককে ফাইলের পেছনে দৌড়াতে হয় না। ই-নথি ও ই-জিপি টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ ও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, ২০২৬ সালে তাতে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে।
মেঘনা নদীর পানি শোধনের জন্য নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও গন্ধর্বপুর এলাকায় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
মাটির নিচ থেকে পানি তোলার পরিমাণ ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনায় ঢাকার পানির স্তর আর নিচে নামছে না, যা ভূমিধস বা পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে শহরকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল ওয়াসার পানি পানের অযোগ্য। এই অপবাদ ঘোচাতে নতুন এমডি আব্দুস সালাম ব্যাপারী এবং মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একযোগে কাজ করছেন।
ওয়াসা দাবি করছে তাদের পাম্প থেকে বের হওয়া পানি ১০০ ভাগ বিশুদ্ধ। তবে গ্রাহকের বাড়ির পুরনো পাইপ বা নোংরা ট্যাঙ্কের কারণে পানির মান নষ্ট হয়।
কোথাও ময়লা পানির অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত সমাধানের জন্য একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতিটি নাগরিকের কল দিয়ে যাতে সরাসরি পানযোগ্য পানি পৌঁছে দেওয়া যায়।
২০২১ সাল থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেওয়ায় ওয়াসা এখন পুরোপুরি ‘ওয়াটার সাপ্লাই’ এবং ‘সিউয়ারেজ’ বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করতে পারছে।
২০৫০ সালকে সামনে রেখে ঢাকার শতভাগ এলাকাকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।
নতুন নতুন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে বর্জ্য সরাসরি নদীতে না ফেলে তা শোধন করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা ঢাকার নদীগুলোর দূষণ কমাতে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা ওয়াসা এখন আর একটি লোকসানি সংস্থা নয়। গত কয়েক বছরে সংস্থাটি তাদের আর্থিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার মতো উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি ওয়াসা এখন নিজস্ব আয় থেকে যথাসময়ে শোধ করছে।
দুর্নীতি কমিয়ে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়ানো হয়েছে। অপারেশন ও মেইনটেইন্যান্স খরচ বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা সংস্থাটিকে একটি বাণিজ্যিক ও টেকসই মডেলে রূপান্তর করেছে।
নতুন এমডি প্রকৌশলী আব্দুস সালাম ব্যাপারীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তর ও দক্ষিণ সিটির নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৩৬টি ওয়ার্ডে আধুনিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পর এখন নতুন করে জনবল বিন্যাস এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখাও তার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তবে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক সমর্থন এবং আব্দুস সালাম ব্যাপারীর কারিগরি দক্ষতা মিলে ঢাকা ওয়াসা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা সংস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দৌড়ে এখন সবচেয়ে এগিয়ে।
ঢাকা ওয়াসার ২০২৬ সালের এই চিত্রটি আশাব্যঞ্জক। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুরাতন জরাজীর্ণতা কাটিয়ে একটি স্মার্ট, স্বচ্ছ এবং নাগরিক-বান্ধব ওয়াসা গড়ে তোলার যে শপথ নতুন নেতৃত্ব নিয়েছে, তা সফল হলে ঢাকা হবে একটি আধুনিক বাসযোগ্য নগরী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্দেশনায় এবং আব্দুস সালাম ব্যাপারীর কারিগরি তত্ত্বাবধানে ‘নিরাপদ পানি সবার অধিকার’ এই স্লোগানটি এখন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে।
এএন