বিশেষ প্রতিবেদক
মার্চ ৮, ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে টালমাটাল আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। এই সংকটের ঢেউ যখন বাংলাদেশের অর্থনীতির উপকূলে আছড়ে পড়ছে, ঠিক তখনই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, দেশে জ্বালানির মজুত বাড়ছে, তবে সাবধানতা অবলম্বনে এখনই ‘রেশনিং’ প্রথা থেকে বের হচ্ছে না সরকার।
জ্বালানি সংকটে যখন সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় পার করছে, তখন কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি জানান, আজ রোববার বেলা ১১টায় জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং দুপুরের মধ্যে আরও একটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এই দুটি চালানের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ মজুত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। মন্ত্রীর মতে, এই সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে বাজারে তেলের জোগান স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক দূর হবে।
মজুত বাড়লেও সরকার কেন এখনই পূর্ণমাত্রায় তেল সরবরাহ করছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের দিকে আঙুল তোলেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধ মানেই অনিশ্চয়তা। বর্তমানে যে যুদ্ধ চলছে, সেখানে শোধনাগারগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা জানি না এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে। তাই আমাদের কাছে যে মজুত আছে, তার সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমরা রেশনিং চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত একটি ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ যাতে ভবিষ্যতে বড় কোনো সংকটে দেশ অচল হয়ে না পড়ে।
বক্তব্যে মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোও খোলামেলা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন জ্বালানি খাত ঋণে জর্জরিত এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর। এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
প্রতিদিন মানুষের কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে আমাদের প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি মানুষের ভোগান্তি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে।
বাজারে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে, যুদ্ধের অজুহাতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারে। এই গুঞ্জন বা আতঙ্ককে 'বিরোধীদের অপপ্রচার' হিসেবে আখ্যা দিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী স্পষ্ট ঘোষণা দেন আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না।
তিনি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন, "আমাদের হাতে পর্যাপ্ত মজুত আছে এবং নতুন চালানও আসছে। তাই অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করার প্রয়োজন নেই। বাজারে সংকট নেই, কেবল ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আমরা শৃঙ্খলার স্বার্থে রেশনিং করছি।
আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য বেশ ঘটনাবহুল। একদিকে জ্বালানিমন্ত্রী তেলের মজুত বাড়ার খবর দিলেন, অন্যদিকে আজ সকালেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসের আলোকসজ্জা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। এই দুটি খবরকে এক সুতোয় গাঁথলে বোঝা যায়, সরকার বর্তমানে 'জ্বালানি কূটনীতি' এবং ‘আভ্যন্তরীণ সাশ্রয়’ এই দুই নীতিতে অটল রয়েছে।
পেট্রোল পাম্পগুলোতে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত মানুষের মধ্যে বিরাজমান ‘ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা’ থেকে তৈরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি রেশনিং পদ্ধতি সফলভাবে কার্যকর করা যায় এবং নতুন জাহাজগুলো থেকে তেল খালাস করে দ্রুত পাম্পে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
এএন