নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)
মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম
বাঙালি জাতির শৃঙ্খলমুক্তির দিন, আজ ২৬ মার্চ। ৫৪ বছর আগে এই দিনটিতেই শুরু হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যা বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম দিয়েছিল 'বাংলাদেশ' নামক এক স্বাধীন ভূখণ্ড।
সেই অকুতোভয় বীর সন্তানদের স্মরণে আজ সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ঢল নেমেছে সর্বস্তরের মানুষের। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন ১৯৭১-এর বীর শহীদরা।
বৃহস্পতিবার ভোরের আকাশ যখন লালিমায় রাঙা হয়ে উঠছিল, তখনই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল আর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে।
সকাল ঠিক ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক দিয়ে মূল বেদিতে প্রবেশ করেন।
প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং তার পরপরই প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে তারা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই নীরবতা যেন বলে দিচ্ছিল, জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কোনোদিন ভুলবে না।
এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর একটি সমন্বিত চৌকস দল সশস্ত্র অভিবাদন (গার্ড অব অনার) প্রদান করে। বিউগলের করুণ সুর আর রাষ্ট্রীয় সালামের মধ্য দিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ।
আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আরও একবার শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ নেতারা। একে একে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে বাংলাদেশের বীরদের প্রতি বিশ্ববাসীর সম্মান প্রদর্শন করেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল ৭টার দিকে স্মৃতিসৌধের প্রবেশদ্বার সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই ৮৪ একরের বিশাল প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
লাল-সবুজের পোশাক পরে, হাতে বর্ণিল ফুলের তোড়া আর কপালে জাতীয় পতাকার ব্যান্ড বেঁধে সাধারণ মানুষ সারিবদ্ধভাবে বেদির দিকে অগ্রসর হন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মিছিলে মিছিলে স্মৃতিসৌধ এলাকা মুখরিত করে তোলে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিসৌধের মূল বেদি ফুলে ফুলে ঢাকা পড়ে যায়। গোলাপ, গাঁদা আর রজনীগন্ধার স্তূপে যেন এক পুষ্পশয্যা তৈরি হয় শহীদদের স্মরণে।
অভিভাবকরা তাদের ছোট ছোট সন্তান এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে। শিশুদের হাতে থাকা ছোট ছোট পতাকা আর তাদের উচ্ছ্বাস এক সুন্দর আগামীর ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধারা আজ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা স্মৃতিচারণ করেন একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা।
উপস্থিত জনতার কণ্ঠে আজ ধ্বনিত হয়েছে বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দৃপ্ত শপথ।
তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মতে, স্বাধীনতা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি দায়িত্ব। যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে শহীদরা প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই দেশ গড়ে তোলাই হবে তাদের প্রতি আমাদের আসল শ্রদ্ধা।
দিবসটি উপলক্ষে সাভারের আমিনবাজার থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব এবং ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে আসা মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ আজ কেবল ইট-পাথরের মিনার নয়, বরং কোটি বাঙালির আবেগ আর জাতীয় সংহতির এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ফুলেল শ্রদ্ধার এই আয়োজন যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
এএন