আমার সংবাদ ডেস্ক
জুন ৩, ২০২৬, ০২:০৬ পিএম
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর বসানোর প্রাথমিক ভাবনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে সরকার। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম এই মাধ্যম দুটির ওপর কোনো ধরনের নতুন কর না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমজনতার ওপর যেন করের বাড়তি বোঝা চেপে না বসে, সেই বিষয়টি বিবেচনা করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর বাতিলের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) সূত্রে এই স্বস্তিদায়ক তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে গত ১২ মে গণমাধ্যমে ‘বাইকের চাকা ঘুরলেই কর’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ পাওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান মোটরসাইকেল চালকেরা। কর আরোপের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাঁরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঘেরাও, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার মতো নানা কর্মসূচি পালন করেন।
আন্দোলনকারী চালকদের মতে, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন আর কেবল শৌখিনতার বস্তু নয়, বরং দৈনন্দিন চলাচল ও অর্থ উপার্জনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাইড শেয়ারিং চালকেরা জটলা এড়াতে এর ওপর নির্ভরশীল। এমনকি নারীদের নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচলের ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখছে।
মোটরসাইকেল মালিকদের ইতিমধ্যেই রেজিস্ট্রেশন ফি, রোড ট্যাক্স, ফিটনেস ও জ্বালানি করসহ নানা খাতে নিয়মিত অর্থ গুনতে হয়। এর ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর ধার্য করা হলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ চরম আর্থিক সংকটে পড়তেন।
রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এই খাত থেকে অগ্রিম আয়কর বাবদ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সম্মতি পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন।
তবে জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে প্রস্তাবিত করের হার অর্ধেক করার এবং পরবর্তীতে তা পুরোপুরি বাতিলের নির্দেশ দেন। তবে একটি শর্ত রাখা হয়েছে—১৫০ সিসির চেয়ে বেশি ক্ষমতার বিলাসবহুল মোটরসাইকেল মালিকদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে টিআইএন (TIN) থাকতে হবে।
বর্তমানে দেশে কেবল সিএনজি অটোরিকশা, কার, জিপ, বাস ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর নেওয়ার নিয়ম চালু আছে। মোটরসাইকেল বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অতীতে কখনোই এই কর ছিল না। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসি ও এলাকাভেদে ১ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর আদায়ের একটি ছক তৈরি করা হয়েছিল।
প্রাথমিক খসড়ায় ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি বাইকের জন্য ১০ হাজার টাকা করের প্রস্তাব করা হয়। তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরবর্তীতে তা কমিয়ে যথাক্রমে ১ হাজার, ৩ হাজার ও ৫ হাজার টাকা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পুরোপুরি বাতিল করা হলো।
বর্তমানে দেশে বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০টি। এর মধ্যে ১১০ সিসির নিচের বাইকগুলো বাদ দিলেও করযোগ্য মোটরসাইকেলের সংখ্যা দাঁড়াত প্রায় ৩৮ লাখ। গড়ে ৪ হাজার টাকা করে কর ধরা হলে সরকারের ঘরে প্রতি বছর আসত প্রায় ১,৫২০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বর্তমানে প্রাইভেট কার ও জিপের ক্ষেত্রে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এ ছাড়া ধারণক্ষমতা ও ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন দূরপাল্লার বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও লরির ক্ষেত্রে ৭,৫০০ টাকা থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বিআরটিএর ফিটনেস নবায়নের সময় আদায় করা হয়ে থাকে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ ও টিভিএসের মতো ব্র্যান্ডগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা ছিল, নতুন কর আরোপ করা হলে এই উদীয়মান শিল্পের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ত।
মোটরসাইকেলের পাশাপাশি কপাল খুলেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদেরও। নতুন বাজেটে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সিসিভেদে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করের যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাও সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।
সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন না থাকায় দেশে এই অটোরিকশার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, দেশজুড়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকা শহরেই এর সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ লাখ। সরকারের এই মানবিক সিদ্ধান্তে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় স্বস্তি মিলল।
এএন