আমার সংবাদ ডেস্ক
জুন ১৪, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দেশব্যাপী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ মহাপরিকল্পনায় জোরালোভাবে শামিল হয়েছে ঢাকা প্রশাসনিক ও সেবামূলক সংস্থাসমূহ। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার ফুসফুস খ্যাত এবং পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগার কম্পাউন্ডে এক বর্ণাঢ্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড সুয়ারেজ অথরিটি (ঢাকা ওয়াসা)।
শনিবার সকালে রাজধানীর আফতাবনগর সংলগ্ন দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগার প্রাঙ্গণে এই মহতী কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা ওয়াসার সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিনুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে এই দেশব্যাপী অভিযানের সূচনা করেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, সুপেয় পানির আধার রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব মেগাসিটিতে রূপান্তরের যে প্রত্যয় ঢাকা ওয়াসা গ্রহণ করেছে, এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তারই একটি অনন্য এবং সময়োপযোগী বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বিশ্বে বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন এক মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ঝুঁকির একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছে। এই সংকট উত্তরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সবুজ ভূখণ্ড রেখে যাওয়াই এই কর্মসূচির মূল দর্শন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ও মানবিক আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্ব-স্ব অবস্থান থেকে এগিয়ে আসছে। ঢাকা ওয়াসা, যা রাজধানীর কোটি মানুষের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত, তারা কেবল নাগরিক সেবাই নয়, বরং পরিবেশের সুরক্ষাতেও সমভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দাশেরকান্ধির মতো একটি আধুনিক ও বিশাল পয়ঃশোধনাগার কম্পাউন্ডে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা সামগ্রিক পরিবেশগত উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
শনিবার সকালে দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগার কম্পাউন্ডে এক উৎসবমুখর ও আন্তরিক পরিবেশে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীগণ এই কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ওয়াসার প্রশাসনের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাবৃন্দ। তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) জনাব এ. কে. এ. এম ফচলুল হক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) জনাব মো. মিজানুল হক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেইন্যান্স) জনাব মির্জা গোলাম কিবরিয়া এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (রিসোর্স প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জনাব মো. আজিজুল হক।
এছাড়াও ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন স্তরের উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগারের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই সময় উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রত্যেকেই প্রাঙ্গণের নির্ধারিত স্থানে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেন।
কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ঢাকা ওয়াসার সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে শতভাগ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, একটি সুস্থ ও সচল শহরের জন্য পর্যাপ্ত সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আজ এক জনবহুল মেগাসিটি, যেখানে প্রতিনিয়ত কংক্রিটের রাজত্ব বাড়ছে। এই অবস্থায় শহরের ফুসফুসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের যত্রতত্র গাছ লাগাতে হবে এবং তার পরিচর্যা করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা আমাদের দেশের পরিবেশগত ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ঢাকা ওয়াসা এই মহৎ উদ্যোগের অংশ হতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগারটি যেমন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এবং আধুনিক বর্জ্য শোধন কেন্দ্র হিসেবে ঢাকাবাসীর সেবা দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি এর চারপাশের খালি জায়গায় ব্যাপক সবুজায়ন করার মাধ্যমে এটিকে একটি পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন গ্রিন জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। শুধুমাত্র গাছ লাগানোই নয়, বরং প্রতিটি চারার সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের কঠোর নির্দেশ দেন।
রাজধানীর আফতাবনগর সংলগ্ন দাশেরকান্ধি পয়ঃশোধনাগারটি ঢাকা ওয়াসার অন্যতম একটি সফল ও আধুনিক মেগা প্রকল্প। হাতিরঝিলসহ আশপাশের বিশাল এলাকার পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদীতে ফেলার মাধ্যমে নদীদূষণ রোধে এই শোধনাগারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এবার এই আধুনিক প্রযুক্তির সাথে প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে।
বিশাল এই কম্পাউন্ডের চারপাশের খালি জায়গা, রাস্তার ধার এবং লেকের পাড় ধরে পরিকল্পিত উপায়ে কয়েক হাজার গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এখানে এমন সব গাছের প্রজাতি নির্বাচন করা হয়েছে যা মাটির ক্ষয়রোধ করবে, বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে এবং একই সাথে শোধনাগার এলাকার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পরিবেশবিদদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে দাশেরকান্ধি ও তার সংলগ্ন আফতাবনগর, বাড্ডা এবং খিলগাঁও এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকগণও পরিবেশ রক্ষায় ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব এ. কে. এ. এম ফচলুল হক বলেন, এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ওয়াসার প্রতিটি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থানে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মো. মিজানুল হক আশ্বস্ত করেন, পরিবেশ উন্নয়ন ও সবুজায়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে ওয়াসা সর্বদা আন্তরিক। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ তথা অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেইন্যান্স বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মির্জা গোলাম কিবরিয়া এবং রিসোর্স প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মো. আজিজুল হক তাঁদের বক্তব্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি অর্জনে এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কারিগরি ও কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা জানান, সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই ঢাকা ওয়াসা তার প্রতিটি অবকাঠামো সংলগ্ন এলাকায় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলছে।
ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দাশেরকান্ধি থেকে শুরু হওয়া এই বৃক্ষরোপণ অভিযান পর্যায়ক্রমে ওয়াসার অন্যান্য বুস্টার স্টেশন, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার, পদ্ম, জশলদিয়া প্রকল্প এলাকা এবং মিরপুরসহ বিভিন্ন জোনাল অফিসের খালি জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সংস্থাটির লক্ষ্য, আগামী ৫ বছরে তাদের আওতাধীন প্রতিটি স্থাপনাকে সবুজে শ্যামলে ভরিয়ে তোলা।
অনুস্থানের সমাপ্তি লগ্নে ঢাকা ওয়াসার এমডি মো. আমিনুল ইসলাম ঢাকাবাসীর প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি সাধারণ নাগরিকেরা তাদের বাড়ির ছাদ, ব্যালকনি বা আঙিনায় গাছ লাগাতে এগিয়ে আসেন, তবেই ঢাকাকে সত্যিকারের একটি সবুজ ও স্বাস্থ্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ১৩ জুনের এই বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসা কেবল গাছই লাগায়নি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিজেদের সক্রিয় অংশীদারিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। পরিবেশ সচেতনতার এই সুবাতাস সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই এখন সাধারণ নগরবাসীর প্রত্যাশা।
জেএইচআর