নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ২, ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
জনগণকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও দলীয় প্রভাবে প্রভাবিত কোনো অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হলে, তা খোদ বর্তমান সরকারের জন্যই চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যেসব শাসক বা সরকার জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অকার্যকর করে তোলে, তারা মূলত নিজেদের অজান্তেই এক একটি ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ বা ধ্বংসাত্মক শক্তি তৈরি করে। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী বা এককেন্দ্রিক থাকে না। ফলে আজ রাজনৈতিক স্বার্থে যে প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতার হাতবদল হলে সেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক ফলাফলের প্রথম শিকার কিন্তু বর্তমান কর্তাব্যক্তিদেরই হতে হবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ অধিপরামর্শ সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক এই যৌথ সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে সরকারের প্রস্তাবিত খসড়া আইনের বিভিন্ন দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে খসড়া আইনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে ১৯টি সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সংশোধনী প্রস্তাবনা ও সুপারিশ তুলে ধরেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, টিআইবি এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পেশ করা এই ১৯ দফা সুপারিশ যদি নতুন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়, তবে এটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হবে যে দেশে একটি সত্যিকারের স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গড়ে তোলার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের ন্যূনতম কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই।
তিনি বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনী ইশতেহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দলটির পক্ষ থেকে এর আগে ৩১ দফার রাষ্ট্রসংস্কার কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার এবং ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের যে দৃঢ় অঙ্গীকার দেশের মানুষের সামনে করা হয়েছিল, তা যদি তারা বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা করে এবং যথাযথভাবে পালন করতে চায়, তবে সরকারের যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কেবল ক্ষমতার লোভ সংবরণ করে রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজানোর মানসিকতা।
সভায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক প্রবণতার কথা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, বাংলাদেশে যখনই যারা ক্ষমতায় আসে কিংবা সরকারের নীতি-নির্ধারণী বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে আসীন হয়, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্তম্ভ বা মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দেয়।
বিশ্ব রাজনীতির উদাহরণ টেনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান বিশ্বে আমাদের চেয়েও অনেক বেশি স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী ও একনায়কতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা অনেক দেশেই বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সেসব দেশেও জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে নগ্ন দলীয়করণ করার কিংবা সম্পূর্ণ অকার্যকর সংস্থায় পরিণত করার এমন নিকৃষ্ট নজির খুব কম দেশেই দেখা যায়। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, তবে এই ধ্বংসাত্মক ও দলীয়করণের সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সরকারের ভেতরে এবং বাইরে একটি ‘পরিবর্তনবিরোধী ও সংস্কারবিরোধী চক্র’ এখনও অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে বলে দেশবাসীকে সতর্ক করেন টিআইবি প্রধান। তিনি মনে করেন, এই আইন সংস্কারের পথে যে প্রতিরোধ বা বাধা আসছে, তা কেবল বাইরে থেকে রাজনৈতিক মহলের চাপ নয়। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও ঢের বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে দেশের আমলাতন্ত্র।
প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর যে খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে, তার ভেতরের বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় এই আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য এবং কমিশনকে সরকারের একটি সাধারণ দাপ্তরিক উইং বা অধীনস্থ শাখা বানিয়ে রাখার মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে। আমলারা নিজেদের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখতে এবং কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার ডানা ছেঁটে দিতেই এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত খসড়া তৈরি করেছে বলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন।
অধিপরামর্শ সভায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তখনই উন্নত হয় যখন সেখানকার মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রী, আমলা বা রাজনৈতিক নেতার আদেশের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। যদি খসড়া আইনটি বর্তমান রূপেই পাস করা হয়, তবে তা মানবাধিকার রক্ষার বদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আড়াল করার একটি আইনি হাতিয়ারে পরিণত হবে।
উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা সরকারকে অবিলম্বে এই খসড়াটি প্রত্যাহার করে টিআইবি ও হিউম্যান রাইটস ফোরামের সুপারিশমালার আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন গঠনের আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানান। অন্যথায়, সাধারণ মানুষ এই আইনকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রাকে আরও এক দফা পিছিয়ে দেবে।
এএন