হাশেম রেজা
নভেম্বর ৪, ২০২৫, ০৭:৩৬ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একাধিক দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আলোচনায় রয়েছে এক বড় রাজনৈতিক দল, যেটি ৩০০ আসনের মধ্য থেকে ইতোমধ্যে ২৩৭টি আসনে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই ঘোষণা দিয়েছে ৩ নভেম্বর।
এই ঘোষণা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে কখনো উৎসব, কখনো উত্তেজনা, আবার কখনও অভিমান ও বিভাজনের দিকে ধাবিত।
আসুন, দেখি এর ভেতরকার নানা দিক : উল্লাস, ভেতরের বিভাজন, সম্ভাব্য জোট চিত্র, ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিক্রিয়া।
উল্লাস ও মাঠীয় উৎসব : প্রধান দলের ২৩৭ আসনের মনোনয়ন ঘোষণা যেন এক রাজনৈতিক উৎসবের খুদে বার্তা। দলীয় নেতাকর্মীরা মাঠে আনন্দ উল্লাস শুরু করেছেন-কবর জিয়ারত এবং একাধিক জায়গায় উদযাপন অনুষ্ঠানও হয়েছে। কারণ, একটি বড় দল এমন উচ্চ সাফল্যে পৌঁছেছে বলে দেখা যেতে পারে; প্রার্থী তালিকার প্রায় পুরোপুরি সমাধান।
এই ধরনের ঘোষণা সাধারণত দলীয় কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, এতে নির্বাচনি প্রস্তুতি আগিয়ে যায়। এমনি অবস্থায় মনোনয়ন ঘোষণার দিনটিকে দলীয় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে অনেকেই।
উল্লেখযোগ্য হতেই হবে এই মনোনয়ন ঘোষণার মাঝেই রয়েছে ভেতরে উত্তেজনা। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এখনো তাদের ভাগ্য অনিশ্চিত দেখতে পাচ্ছেন। দলীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ ও মনোযোগ প্রায়ই ছিল না। এমন কিছু এলাকায় দেখা যাচ্ছে, মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষোভের আগুনের কারণে দলীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত মনোনয়ন ঘোষণা হয়েছেও দৃষ্টিকোণ ও যৌক্তিকতা পর্যায়ে প্রশ্ন উঠছে। যে এলাকায় মনোনয়ন দেয়া হয়নি বা দেরি হয়েছে, সেই এলাকায় দলে বিভাজন আকার নিচ্ছে। আর যদি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মনে করেন, তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে-তবে আন্দোলন বা ভাঙচুরের ঘটনা লুপ্ত হওয়ার নয়।
উল্লেখযোগ্য সংবাদে বলা হয়েছে, দল এই প্রথম ধাপে ২৩৭ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ৬৩ আসন এখনো উন্মুক্ত রাখছে জোট ও সমম্বয়ের জন্য। এই ধাপেও চাপ রয়েছে মাঠে মনোনয়ন ঘিরে দৌড়ঝাঁপ ও প্রতিযোগিতা।
জোট সহযোগিতার সংগ্রাম : মনোনয়ন ঘোষণা করে দল এটাও জানিয়েছে, যে আগামী সময়ে তারা জোট পার্টি বা আন্দোলন সংগঠনগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত। এই নীতি স্বাগত কারণ একাই নির্বাচন জয় করা কঠিন। তবে এই নীতিতে রয়েছে দ্বিধা ও অভ্যন্তরীণ চাপ।
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রশ্ন করছেন : আমি দীর্ঘদিন দলেই আছি, তবুও মনোনয়ন পাইনি কেন দলীয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ না এনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
জোট বুঝিয়ে মনোনয়ন বাছে কিনা : এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দ্রুত না দিলে দলের একতা ও মনোবল ক্ষুণ্ন হতে পারে। কারণ নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুতির সময় এখন শুরু হতে চলেছে-অনিশ্চয়তার মধ্যে দলে বিভাজনের সুযোগ সৃষ্টি হতেই পারে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অবস্থান : মনোনয়ন না পাওয়া প্রত্যাশীরা দুই দলে ভাগ হয়ে পড়ছেন—একাংশ শান্ত প্রতীক্ষায় এবং অন্যাংশ নীরব বা সক্রিয় বিরোধীতায়। তারা বলছেন, মনোনয়ন না পেয়ে আমরা ফিরে যাচ্ছি না— দলে থাকার সত্বেও কেন বাদ পড়লাম। জোট বা বড় নেতার বন্ধুবান্ধব ছাড়া মনোনয়ন হয়ে যাচ্ছে-আমার মতো প্রতি জেলা-উপজেলায় কর্মীর অবস্থা কোথায়। এই ধরনের অভিযোগগুলো দলের জন্য সংকেত। কারণ মনোনয়ন দেয়া মানে শুধু একজন প্রার্থী পাওয়া নয়—এটি দলের আস্থার জন্মও। যদি অনেক কর্মীর মনোবল ভেঙে যায়, তাহলে মাঠে প্রস্তুতির দিক থেকে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিপরীতে অন্যান্য দল ও প্রার্থীরা : বড় দল বাদ দিয়েছে না সেক্টর পুরোপুরি— বেশকিছু আসন এখনো অজানা। এ অবস্থায় ছোট ও মাঝারি দলগুলো বলছে, আমরা মনোনয়ন তালিকার বাইরে পড়েছি কিনা আমাদের জাতীয় পরিণতিতে কত আসন পাব, বড় দল গিয়ে কত আসন নিচ্ছে তারা কী জোট ভাবছে। ছোট দল বা জোট অংশীদাররা এখন সুস্পষ্টতা চাইছেন : আমরা দল সহস্রাব্দে অংশ নিয়েছি, তবে মনোনয়ন তালিকা অজানা থাকায় ভুল সংকেত যাচ্ছে। তারা বলছেন, বড় দল হয়তো নিজে বেশি আসন নিয়ে গিয়ে জোট করে কিছু অংশ ভাগ করবে-কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়।
নীতি ও কৌশলগত প্রশ্ন : এই অবস্থা জেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বড় নীতিগত ও কৌশলগত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
১. মনোনয়ন নীতিগতভাবে কেমন হয় শুধু রাজনৈতিক তাৎপর্য, জনদরদ, কর্মীবাহুলতা কি কি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
২. আসন বিনিময় কাকে কত শতাংশে দেয়া হবে বড় দল জোট বলছে, কিন্তু বিভাজনের ঝুঁকি সহজেই বাড়ছে।
৩. মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ কি নৈতিক ও কার্যকর প্রত্যাশীরা যদি বিব্রত হয়, তাহলে দলীয় মনোবল কতদূর অক্ষুণ্ন থাকবে।
৪. মাঠ প্রস্তুতি ও সময়সাপেক্ষ মনোনয়ন কার্যক্রম-তা কি দেরি হয়ে যাচ্ছে সময় বাড়লে প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রস্তুতির সুযোগ বাড়বে। বিশ্লেষকরা বলেন, সদ্য ঘোষিত ২৩৭ আসনের তালিকা দ্রুত হলেও পুরোটাই চূড়ান্ত নয়, পরিবর্তন হতে পারে জোট ও সমন্বয়ের আলোকে।
তথ্যচিত্র ও ভবিষ্যৎ কর্মপথ : বড় দল ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে ২৩৭ আসনে মনোনয়ন। এখনও প্রায় ৬০-৭০ আসন জোট বা অংশীদারদের জন্য রাখা হয়েছে। মনোনয়ন না পাওয়া অনেক কর্মী এখন দলে সন্দেহ ও ব্যক্তিগত মর্মাহত। ছোট ও মাঝারি দলগুলো স্পষ্টতা চাইছে-নিজেদের অবস্থান কোথায়। দলীয় নেতৃত্বকে দ্রুত মনোযোগী হতে হবে— ভেতরে ফাটল না বাড়িয়ে, জোট ও মনোবল একসঙ্গে রাখতে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন কর্মসূচি কেবল প্রার্থী বাছাই নয়—এটি দলীয় ঐক্য, কর্মী মনোবল, মাঠ প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক বার্তার অংশ। যখন একটি দল ২৩৭ আসনে ঘোষণা দেয়, তখন উল্লাস হওয়ার কথা হলেও একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগও তৈরি হয়।
মনোনয়ন কার্ড প্রদর্শন করার আগে অবশ্যই ভাবতে হবে— এই মনোবল স্থায়ী হবে কিনা, ভাগাভাগি ও সমন্বয় কি সহায়ক হবে কিনা, একটি দল যদি শুধু নিজেই এগিয়ে যায়, দলীয় কর্মীর শক্তি ও বিশ্বাস ভাগাভাগি না হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনে খারাপ ফলের সম্ভাবনা থেকে যাবে। বিশেষ করে যখন ছোট ও অংশীদার দলগুলো বঞ্চিত বোধ করছে-তখন তাদের ভূমিকা রাজনৈতিক সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যোগাযোগের যুগে মনোবল ভাঙতে সময় লাগে না—একবার দলে বিশ্বাস কমে গেলেই মাঠ প্রস্তুতি ও ভোট সইয়ের ক্ষেত্রে দারুণ বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই বড় দলগুলোর জন্য এখন সময়—উচ্চ মনোবলকে ধরে রাখা, মনোনয়ন না পাওয়া কর্মীদের কাজে যুক্ত রাখা, অংশীদারদের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি শুধু নেটিভ মনোনয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি হবে দলীয় অভিন্নতা, কর্মী উৎসাহ ও দলের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপার। মনোনয়ন তালিকা মাত্র একটি সূচনা; আসল পরীক্ষা হবে দলের মাঠ প্রস্তুতি, জনসংযোগ, কর্মী একতা ও নির্বাচনকালীন সমন্বয়ে। এই সময়— পরিকল্পনা যত পরিষ্কার, ভেতরের সংঘর্ষ থেকে যত দ্রুত সরে আসা, রাজনৈতিক দল তত বেশি প্রস্তুত হবে। মনোবলই রাজনৈতিক জয় নিশ্চিত করে।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক
ইএইচ