নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ০৮:৫৪ পিএম
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আবারও শারীরিক জটিলতায় পড়ায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসে সংক্রমণ বাড়ার কারণে শ্বাসকষ্ট তীব্রতর হওয়ায় মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসা আরও নিবিড়ভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার রাতেই হাসপাতালের দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক শারীরিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে তার বুকের ইনফেকশন আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। এর ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে অসুবিধা অনুভব করছেন।
পরিস্থিতি বিবেচনায় মেডিকেল বোর্ড তাকে কেবিনেই বিশেষ পর্যবেক্ষণ জোনে রাখে এবং অতিরিক্ত মনিটরিং শুরু করে।
২৪ ঘণ্টার ক্রিটিক্যাল অবজারভেশনে রাখার সিদ্ধান্ত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, সোমবার বোর্ডের বৈঠকে রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। নতুন করে কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করার পর সিদ্ধান্ত হয়, এখনই তাকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা কেবিনেই কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকরা মনে করছেন, সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে, যা হার্ট এবং লাং দুটো অঙ্গকেই কিছুটা চাপে ফেলেছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা তার চিকিৎসা আরও সতর্কভাবে পরিচালনা করছি।
সোমবার সন্ধ্যার আগেই ডা. জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি আশাবাদী, মহান আল্লাহর রহমতে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।
এ সময় তিনি বলেন, চেয়ারপারসন সর্বদা জনগণের প্রার্থনা ও ভালবাসাকে গুরুত্ব দেন। আজও চিকিৎসার আপডেট জানিয়ে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন। হাসপাতালে যাওয়ার আগে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি এর আগের দিন রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’ থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিনের পুরোনো জটিলতাগুলির একটির হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠায় তার শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর বেশ কয়েকটি স্ক্যান ও জরুরি পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী জানান, চেস্ট ইনফেকশন বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে হৃদযন্ত্রে এবং ফুসফুসে। প্রথম ১২ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বহু বছরের দীর্ঘ স্বাস্থ্য জটিলতা ৮০ বছরের কাছাকাছি বয়স সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
তার জটিলতা সমূহের মধ্যে রয়েছে— আর্থ্রাইটিস ডায়াবেটিস কিডনি জটিলতা ফুসফুসের সমস্যা চোখের অবনতি উচ্চ রক্তচাপ এসব জটিলতা মাঝে মাঝে তীব্র আকার ধারণ করায় চলাফেরা, খাবার গ্রহণ এমনকি স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
চিকিৎসকরা বহুবার জানিয়েছেন, তার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ছাড়া সম্ভব নয়। বিদেশে চিকিৎসা, পরে দেশে ফেরত আসা গত ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দফায় মেডিকেল প্রক্রিয়া ও চেকআপের পর প্রায় চার মাস—মোট ১১৭ দিন অবস্থান করেন। চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে বাংলাদেশে ফিরে এলে কিছু সপ্তাহ স্থিতিশীল থাকলেও পরে নিয়মিত চেকআপের অংশ হিসেবে আবারও তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য সংক্রমণও দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। এজন্য হাসপাতাল ছাড়ার পরও তাকে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। পরিবার ও দলের নেতাদের উদ্বেগ তার আকস্মিক শারীরিক জটিলতা বাড়ার খবরে পরিবার ও দলের নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দলের নেতারা নিয়মিত হাসপাতালে যোগাযোগ রাখছেন। তবে চিকিৎসকদের অনুরোধে হাসপাতাল এলাকায় ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা।
এক নেতা জানান, পরিস্থিতি খুব জটিল না হলেও যেহেতু তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ একসঙ্গে আক্রান্ত, তাই চিকিৎসকদের পরামর্শে সবাই আপাতত দূর থেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
চিকিৎসকদের প্রধান লক্ষ্য: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্থিতিশীল করা চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে তার প্রধান সমস্যা হচ্ছে—ফুসফুসে থাকা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, যা হৃদযন্ত্রে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাই চিকিৎসার মূল ফোকাস হচ্ছে— সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অক্সিজেন স্যাচুরেশন বজায় রাখা হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হলে অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন নিয়মিত স্ক্যান ও ল্যাব টেস্ট পরবর্তী অবস্থার ওপর নির্ভর করবে চিকিৎসার দিক চিকিৎসকদের ভাষ্য, আগামী ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য উন্নতি হলে তাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে অবস্থার অবনতি হলে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ইউনিটে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করতে হতে পারে।
খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক জটিলতা তার দীর্ঘদিনের দুর্বল স্বাস্থ্যগত অবস্থারই ধারাবাহিকতা। হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সংক্রমণ চিকিৎসকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। দেশজুড়ে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা চলছে।