আমার সংবাদ ডেস্ক
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
শরিয়াহর অগ্রাধিকার ও জনকল্যাণ: ইসলামী আন্দোলনের ৩০ দফা ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এক ভিন্নধর্মী ও সুদূরপ্রসারী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে দলের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বা পীর সাহেব চরমোনাই এই ইশতেহার তুলে ধরেন।
জনপ্রত্যাশার ইশতেহার শিরোনামের এই দলিলে কেবল ধর্মীয় আদর্শ নয় কমা বরং রাষ্ট্র সংস্কার কমা অর্থনীতি এবং সামাজিক সুরক্ষার এক সমন্বিত রূপরেখা পেশ করা হয়েছে।
ইশতেহারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ইসলামী শরিয়াহর প্রাধান্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। তবে একে কেবল ধর্মীয় আচার আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কমা একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দলটির দাবি কমা শরিয়াহর প্রয়োগ ঘটলে দুর্নীতি কমা দুঃশাসন এবং সামাজিক অবিচার চিরতরে নির্মূল হবে।
ইসলামী আন্দোলন তাদের ইশতেহারে ৩০টি মৌলিক দফার পাশাপাশি ১২টি বিশেষ কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র সংস্কারে ৬ দফা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চেয়েছে যে কমা তারা কেবল একটি ধর্মীয় সংগঠন নয় কমা বরং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তাদের কাছে আধুনিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা রয়েছে।
একটি কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হলো কমা ইসলামী আন্দোলন তাদের ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বলছে কমা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণে তারা দায়বদ্ধ। সাম্য কমা মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার কমা যা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল কমা তা প্রতিষ্ঠাই তাদের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।
দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ইসলামী আন্দোলন দীর্ঘকাল ধরে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। ইশতেহারে এই বিষয়টি জোরালোভাবে স্থান পেয়েছে। তাদের মতে কমা বর্তমান বিজয়ী সব নিয়ে যায় বা উইনার টেকস অল পদ্ধতি দেশে বিভাজন তৈরি করে। আনুপাতিক পদ্ধতি চালু হলে সংসদে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে এবং ক্ষুদ্র দলগুলোও তাদের ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব পাবে।
সাধারণ মানুষের মন জয় করতে ইসলামী আন্দোলন বেশ কিছু যুগান্তকারী আর্থিক প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়েছে। হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের স্বাবলম্বী করতে কোনো প্রকার সুদ বা জামানত ছাড়াই এককালীন ঋণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। এটি বেকারত্ব দূরীকরণে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষিকার্ড এবং সাধারণ মানুষের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড চালুর মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছে দলটি। তারা সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে নৈতিকতাভিত্তিক কমা কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে কমা কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিধারী ও যোগ্য আলেমদের সরকারি সুযোগ সুবিধার আওতায় আনার মাধ্যমে দেশের বিশাল এক জনশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা ইশতেহারে ঠাঁই পেয়েছে। বিগত বছরগুলোতে আলোচিত গুম কমা খুন ও গায়েবি মামলার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে ইসলামী আন্দোলন।
ইশতেহারে বলা হয়েছে যে কমা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের বাক স্বাধীনতা হবে প্রশ্নাতীত। জুলুম কমা নির্যাতন ও দখলবাজি মুক্ত সমাজ গড়া হবে এবং বাজারের সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্র ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে আনা হবে। নারী অধিকারের প্রশ্নে তারা কেবল সম অধিকার নয় কমা বরং ক্ষেত্রবিশেষে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ইশতেহারে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং একমুখী সেবা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিনিয়োগ সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই ৩০ দফা ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কমা তারা ধর্মীয় আবেগ এবং নাগরিক অধিকারের একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে।
এদিকে, যেমন শরিয়াহর কথা বলা হয়েছে কমা অন্যদিকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পীর সাহেব চরমোনাইয়ের ঘোষিত এই ইশতেহার সাধারণ ভোটারদের মাঝে কতটা সাড়া ফেলবে কমা তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
জেএইচআর