ধর্ম ডেস্ক
ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০৫:৫০ পিএম
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো রোজা। রমজান মাসে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুকিম মুসলমান নর, নারীর ওপর রোজা রাখা ফরজ। রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মসংযম, আল্লাহভীতি (তাকওয়া) ও নৈতিক শুদ্ধতার এক সার্বিক অনুশীলন। রোজা সঠিকভাবে আদায়ের জন্য এর নিয়ম ও নিয়ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আরবি ‘সাওম’ শব্দের অর্থ বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার, সহবাস এবং রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা: ১৮৩)
নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ হলে রোজা ফরজ হয়, মুসলমান হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, সুস্থ ও সক্ষম হওয়া, মুকিম হওয়া (সফরে না থাকা), নারীদের ক্ষেত্রে হায়েজ, নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া।
রোজা শুদ্ধভাবে পালনের জন্য কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক:
সেহরি খাওয়া: সেহরি খাওয়া সুন্নাহ। শেষ রাতে সেহরি খেলে রোজা পালনে শক্তি পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরিতে বরকত রয়েছে। (সহিহ বুখারি)
সুবহে সাদিকের আগে রোজার প্রস্তুতি: ফজরের আজানের আগেই পানাহার শেষ করতে হবে। আজান শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে পানাহার বন্ধ করা জরুরি।
রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা: রোজার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার, ধূমপান, সহবাস ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। মিথ্যা, গিবত, অশ্লীল কথা ও অন্যায় কাজ থেকেও দূরে থাকা রোজার আদব।
ইফতার করা: সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নাহ। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম।
তারাবিহ ও অন্যান্য ইবাদত: রমজানে ফরজ নামাজের পাশাপাশি তারাবিহ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও সদকায় মনোনিবেশ করা রোজার পূর্ণতা আনে।
নিয়ত রোজার মূল ভিত্তি। নিয়ত অর্থ অন্তরের সংকল্প। রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ফরজ নয়, বরং মনে মনে রোজা রাখার দৃঢ় সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।
রমজানের ফরজ রোজার জন্য নিয়তের সময় হলো, আগের দিন সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত।
নিয়তের একটি সহজ অর্থ হতে পারে, আমি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আগামীকালের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। নিজের ভাষায় মনে মনে এই সংকল্প করলেই রোজা সহিহ হয়।
রমজানের প্রতিটি রোজার জন্য আলাদা নিয়ত করা উত্তম। তবে মনে মনে যদি রমজানের রোজা রাখার সাধারণ নিয়ত থাকে এবং তা ভঙ্গের কোনো কারণ না ঘটে, তবুও রোজা শুদ্ধ হয়।
ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেললে রোজা ভঙ্গ হয় না, রোজা পূর্ণ করতে হয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করলে কাজা ও কিছু ক্ষেত্রে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয়।
রোজার ফজিলত অপরিসীম। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রোজা আমার জন্য, আর আমিই তার প্রতিদান দেব। রোজা গুনাহ মাফের কারণ, দোয়া কবুলের মাধ্যম এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম করে।
রোজা মানুষকে ধৈর্যশীল, সহানুভূতিশীল ও আত্মসংযমী করে তোলে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে অসহায় মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করা যায়, যা সমাজে মানবিকতা ও সহমর্মিতা বাড়ায়।
রোজা ইসলামের এক মহান ইবাদত, যা মানুষকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে। সঠিক নিয়মে, বিশুদ্ধ নিয়তের সঙ্গে রোজা পালন করলে তা কেবল শরীরকে সংযত করে না, বরং মন ও আত্মাকেও পরিশুদ্ধ করে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত রোজা রাখার নিয়ম ও নিয়ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে এই ফরজ ইবাদত আদায় করা। রোজার প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন তা আমাদের চরিত্র, আচরণ ও জীবনযাপনকে আল্লাহমুখী করে তোলে।
জেএইচআর