ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১২:২৫ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত এখন এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত এবং যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশেরও বেশি।

বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো প্রধান শ্রমবাজারগুলোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় সৃষ্ট অস্থিরতা এবং জাহাজ ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন। যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট বাতিল করায় হাজার হাজার শ্রমিক ভিসা ও টিকিট হাতে থাকা সত্ত্বেও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের নিয়োগকর্তারাও বর্তমানে নতুন কর্মী নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মতে, মার্চ মাসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম কর্মী বিদেশে যেতে পেরেছেন। রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস এই অঞ্চলে শান্তি না ফিরলে কেবল জনশক্তি রপ্তানিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই সংকট নিরসনে দ্রুত বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং আটকে পড়া শ্রমিকদের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি।মার্চের পরিসংখ্যান, পতনের এক ভয়াবহ চিত্র : জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসটি ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম মন্দা সময়।

মার্চ ২০২৬-এর চিত্র: এ মাসে বিশ্বের ৭৬টি দেশে মাত্র ৪৪ হাজার ৬৫৮ জন কর্মী গিয়েছেন। মার্চ ২০২৫-এর তুলনায় পতন: গত বছরের মার্চে বিদেশ গিয়েছিলেন ১ লাখ ৫ হাজার ২৭ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৭.৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির তুলনায় পতন: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর মাস ফেব্রুয়ারিতেও যেখানে ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন বিদেশে গিয়েছিলেন, মার্চের শেষে সেই সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩১.৯ শতাংশ।

কেন এই বিপর্যয়, বিমান চলাচল ও নিয়োগকর্তাদের অনীহা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। ১. ফ্লাইট বিপর্যয়: যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ এয়ারলাইন্স তাদের রুট পরিবর্তন করেছে অথবা ফ্লাইট বাতিল করেছে। বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ ফ্লাইট সচল আছে। ২. ভিসা-টিকিট থাকলেও অপেক্ষা: অনেক শ্রমিকের ভিসা এবং টিকিট প্রস্তুত থাকলেও জীবনের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে যাত্রা বাতিল করেছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোই লোক পাঠানো স্থগিত রেখেছে। ৩. নিয়োগকর্তাদের (কফিল) বার্তা: সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কফিলরা বর্তমানে নতুন লোক নিতে ভয় পাচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘এখন এসো না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসো।’

প্রধান বাজারগুলোয় ধস : বিশেষভাবে সৌদি আরব ও কাতার। বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি হলো মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব। পরিসংখ্যান বলছে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌদি আরবের বাজার। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের মোট প্রবাসীর প্রায় ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত, যার মধ্যে এক সৌদি আরবেই আছেন ৭৫ শতাংশ। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা মানেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত।

বায়রা ও রিক্রুটিং এজেন্সির হাহাকার : বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ আবু জাফর বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চরম লোকসানের মধ্যে আছি। টিকিট করা হচ্ছে, আবার রিফান্ড করতে হচ্ছে। ফ্লাইট দেয়া হচ্ছে, আবার বাতিল হচ্ছে।

এয়ারলাইন্সগুলোরও দোষ নেই, যুদ্ধের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কেউ উড়াল দিতে চায় না। সবাই আতঙ্কিত, এটাই মূল বিষয়।’ তিনি আরও জানান, অনেক শ্রমিক ভিসা লাগানো সত্ত্বেও সময় নষ্ট করছেন এই আশায় যে, দুই মাস পর যদি পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

বিকল্প বাজারের খোঁজ, সরকার যা বলছে : মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এবারের যুদ্ধ তা আবারও প্রমাণ করল। গত ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার শ্রমবাজার সমপ্রসারণে বিকল্প গন্তব্য খুঁজছে। জাপান সেল: জাপানে আগামী ৫ বছরে ১ লাখ টেকনিক্যাল ইন্টার্ন পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ‘জাপান সেল’ গঠন করা হয়েছে।

নতুন চুক্তি: ইতোমধ্যে ১৮টি দেশের সঙ্গে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি সই হয়েছে। বন্ধ বাজার সচল: মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের মতো সংকুচিত বা বন্ধ শ্রমবাজারগুলো পুনরায় চালুর জন্য নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। নতুন গন্তব্য: বর্তমানে রোমানিয়া, পর্তুগাল ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত কর্মী পাঠানো হচ্ছে। সর্বোপরি, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেলেও ২০২৬ সালের শুরুটা হলো রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অনিশ্চয়তা দিয়ে। মার্চ মাসের এই পতন কেবল একটি মাসের পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের টানাপোড়েনের সংকেত।

একক কোনো অঞ্চলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা যে জাতীয় অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই সংকট তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। যুদ্ধের কারণে কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের স্বপ্নভঙ্গই হচ্ছে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যমুখী না থেকে দ্রুত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোয় বিকল্প শ্রমবাজার গড়ে তোলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

একইসঙ্গে, যারা বর্তমানে ভিসা ও টিকিট হাতে নিয়ে আটকে আছেন, তাদের ক্ষতি কমাতে বিশেষ বিমান পরিচালনা বা কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। শ্রমবাজারের এই ধস সামাল দিতে সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

Link copied!