ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

সংকটে দেশের রিকন্ডিশন্ড শিল্প

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুন ২০, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

সংকটে দেশের রিকন্ডিশন্ড শিল্প

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের আস্থার প্রতীক হিসেবে রাজত্ব করেছে জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। টেকসই গঠন, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং চমৎকার পুনর্বিক্রয় মূল্যের কারণে টয়োটা, মিতসুবিশির মতো জাপানি ব্র্যান্ডগুলো ছিল দেশের অটোমোবাইল বাজারের মূল চালিকাশক্তি। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পর এই চার দশকের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী আধিপত্যে এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী ধাক্কা লেগেছে। সিসি ভিত্তিক জটিল শুল্কায়নের মারপ্যাঁচ এবং নীতিগত অস্পষ্টতার কারণে দেশের রিকন্ডিশন্ড খাত আজ এক গভীর ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, নতুন বাজেটে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে যে বিশেষ শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে, তা কার্যত নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং ব্র্যান্ড নিউ আমদানিকারকদের সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে, জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মূল হাব বা ১,২০০ থেকে ১,৫০০ সিসির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে। এই কৃত্রিম শুল্ক বৈষম্যের ফলে জনপ্রিয় জাপানি হোম মডেলগুলোর দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এই চরম অসঙ্গতির সুযোগে দেশের আমদানিকৃত গাড়ির বাজার এখন জ্যামিতিক হারে গণচীন এবং প্রতিবেশী ভারতের অটোমোবাইল জায়ান্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। ১,২০০ সিসির নিচে ভারতীয় ছোট গাড়ি এবং ২,০০০ সিসির নিচে চীনা প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো শুল্ক সুবিধার শতভাগ সুফল পেয়ে একচেটিয়া বাজার দখলের পথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও ভোক্তার পছন্দের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে কর কাঠামো এখনই পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। তা না হলে চার দশকের পরীক্ষিত জাপানি গাড়িগুলো বাজার থেকে চিরতরে ছিটকে পড়বে এবং বাংলাদেশের পুরো অটোমোবাইল খাত চীন ও ভারতের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যা দেশের রিকন্ডিশন্ড খাতের হাজার হাজার উদ্যোক্তা ও শ্রমিককে সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিতেপারে। পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তির ইলেকট্রিক ভেহিক্যালস এবং হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে সরকার আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে পরিবেশবান্ধব গাড়ি পৌঁছে দিতে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে বর্তমানের ৯৩ শতাংশ থেকে এক ধাক্কায় কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বিলাসবহুল ইভির ক্ষেত্রে করভার নামিয়ে আনা হয়েছে ৮০ শতাংশে।

সরকারের এই ইভি-কেন্দ্রিক নীতিকে স্বাগত জানালেও হাইব্রিড প্রযুক্তির প্রতি সৎমায়ের মতো আচরণের অভিযোগ তুলেছেন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘দেশে যেখানে এখনো ইভি গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, সেখানে ইভি-কে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিতে গিয়ে হাইব্রিড এবং রেগুলার হাইব্রিড গাড়িকে প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, জাপানি রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অটোমোবাইল বাজারের জন্য একটি বড় ধাক্কা।’

বাজেটে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির জন্য শুল্ক কমানো হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সিসি-ভিত্তিক বৈষম্য। বারভিডার সাবেক সভাপতি মো. হাবিব উল্লাহ ডন এই কাঠামোর ভেতরের আসল গলদটি তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পরিবেশবান্ধব গাড়ির ক্ষেত্রে সাধারণ হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিডকে কেন শুল্কায়নের সময় আলাদা চোখে দেখা হচ্ছে? কারণ দুই ধরনের প্রযুক্তিই তো কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং পরিবেশ রক্ষা করে।

হাবিব উল্লাহ ডন টেকনিক্যাল ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ১ থেকে ২০০০ সিসির মধ্যে জাপানি কোনো প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি বিশ্ববাজারে প্রায় তৈরিই হয় না। এই সিসি রেঞ্জের মধ্যে মূলত চীনা ব্র্যান্ড, কোরিয়ান হুন্দাই এবং ইউরোপের মার্সিডিজ ও বিএমডব্লিউর গাড়ি রয়েছে।

অন্যদিকে, জাপানের বিশ্বখ্যাত টয়োটা বা মিতসুবিশির অধিকাংশ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষমতা শুরুই হয় ২ হাজার ৫০০ সিসি থেকে। ফলে বাজেটে ২০০০ সিসি পর্যন্ত শুল্ক কমানোর কারণে জাপানি গাড়িগুলো কার্যত এই কর সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। এই সুনির্দিষ্ট কাঠামোর কারণে বাজারের সিংহভাগ সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের ব্র্যান্ডগুলোর দখলে চলে যাবে। এই বাজার বৈষম্য দূর করতে বারভিডার পক্ষ থেকে সরকারকে একটি যৌক্তিক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

হাবিব উল্লাহ ডন বলেন, সরকার যদি সত্যি পরিবেশবান্ধব গাড়িকে উৎসাহিত করতে চায়, তবে করসুবিধার আওতা ২ হাজার ২০ সিসি থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ সিসি পর্যন্ত করতে হবে। শুল্ক কাঠামোকে দুই স্তরে বিন্যাস করার পরামর্শ দেন তিনি— প্রথম স্তর : ১ থেকে ১,৮০০ সিসি পর্যন্ত বর্তমান সুবিধা বহাল রাখা। দ্বিতীয় স্তর : ১,৮০১ থেকে ২,৫০০ সিসি পর্যন্ত করভার যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো। এই সংশোধনটি করা হলে জনপ্রিয় জাপানি গাড়ির পাশাপাশি চীন বা অন্যান্য দেশের গাড়িও বাজারে সমান সুযোগ ও ফেয়ার কম্পিটিশন (সুস্থ প্রতিযোগিতা) করতে পারবে।

প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির বাজার যখন চীনের দখলে যাওয়ার উপক্রম, তখন প্রচলিত জ্বালানিচালিত বা ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন গাড়ির ক্ষেত্রেও একই ধরণের নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের মধ্যবিত্তের সবচেয়ে পছন্দের ১,২০০ থেকে ১,৬০০ সিসির নিয়মিত জ্বালানিচালিত গাড়ি আমদানিতে মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে বাজেট বক্তৃতায়।

গাড়ির বাজারের এই তীব্র শুল্ক অসঙ্গতি এবং এক দেশের বাজার অন্য দেশের হাতে চলে যাওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির এই বিষয়ে সরকারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও ভোক্তাদের পছন্দের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। জাপান দীর্ঘ চার দশক ধরে আমাদের পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী এবং তাদের রিকন্ডিশন্ড গাড়িগুলো আমাদের দেশের রাস্তায় টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে প্রমাণিত। বাজেটের চূড়ান্ত পাস হওয়ার আগে এখনো সময় আছে কর কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করার, যাতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠী একচেটিয়া সুবিধা না পায়। শুল্ক নীতি এমন হওয়া উচিত যেন চীন, জাপান ও ভারত সব দেশের পণ্যই বাজারে সমান সুযোগ বা প্লেয়িং ফিল্ড পায় এবং ভোক্তারা কম মূল্যে সেরা গাড়িটি বেছে নিতে পারেন।’

সর্বোপরি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিবেশবান্ধব গাড়ির প্রসার ও স্থানীয় বৈদ্যুতিক ভারী শিল্পকে (বাস ও ট্রাক উৎপাদন) যে শুল্ক ও ভ্যাট মওকুফের সুবিধা দেয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই নীতির আড়ালে চার দশকের পুরনো ও সুপ্রতিষ্ঠিত জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বাজারকে কৃত্রিম সিসি-সীমার বেড়াজালে ফেলে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই দেশীয় অর্থনীতির জন্য সময়োপযোগী হবে না বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বারভিডার শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান শুল্ক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে দেশের মধ্যবিত্তের পছন্দের জাপানি গাড়িগুলো বাজার থেকে চিরতরে ছিটকে পড়বে এবং পুরো অটোমোবাইল খাত চীন ও ভারতের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তাই গাড়ির বাজারে এই একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ভারসাম্য বজায় রাখতে প্লাগ-ইন হাইব্রিডের সুবিধা ২,৫০০ সিসি পর্যন্ত বাড়ানো এবং ১,২০০ থেকে ১,৫০০ সিসির ওপর চাপানো অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

Link copied!