নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ২০, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
দেশের অন্যতম ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রুট ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগাযোগের এই প্রধান ধমনীটি এখন রূপ নিয়েছে এক আতঙ্কের জনপদে। সরকারিভাবে দেশের সব জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার ধীরগতির ও অননুমোদিত যান চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলেও, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বরং আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনেই প্রতিদিন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ তিন চাকার যানবাহন।
দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাস, কোচ এবং ভারী ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহাসড়কে চলছে সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক এবং নসিমন-করিমন। গতির এই চরম অসম প্রতিযোগিতার কারণে এই রুটে প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ঝরে যাচ্ছে সাধারণ যাত্রী, পথচারী এবং পরিবহন শ্রমিকদের তাজা প্রাণ; পঙ্গুত্ব বরণ করে চিরদিনের জন্য অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত পরিবার। নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক উদাসীনতায় মহাসড়কটি এখন পরিণত হয়েছে এক প্রকাশ্য মৃত্যুফাঁদে।
সরেজমিনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশের বারবারিয়া, গোলড়া, সাটুরিয়া মোড়, বাসস্ট্যান্ড, বরংগাইল এবং পাটুরিয়া ঘাট সংযোগ সড়ক এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। দূরপাল্লার দূরন্ত গতির যানগুলো যখন ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলছে, ঠিক তখনই মহাসড়কের মাঝখান দিয়ে কিংবা উল্টো পথে হেলেদুলে চলছে ব্যাটারিচালিত ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
দূরপাল্লার যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এবং নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা পেতে মহাসড়কে এসব নিষিদ্ধ তিন চাকার যান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন বৈধ যানবাহনের চালক, সাধারণ যাত্রী, পথচারী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। কিন্তু বাস্তবে দিন দিন এই অবৈধ যানের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অলিখিত মাসোহারা বা ‘টোকেন’ বাণিজ্যের কারণেই এই নিষিদ্ধ যানগুলো মহাসড়কে দাপট দেখানোর সাহস পাচ্ছে।
মহাসড়কে এই বিশৃঙ্খল গাড়ি চালনার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ও মানসিক চাপে থাকছেন দূরপাল্লার ভারী যানবাহনের চালক এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিক আলতাব হোসেন মহাসড়কের বর্তমান দূরবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যেভাবে দিন দিন তিন চাকার অবৈধ যান বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে এখন বড় গাড়ি চালানো আমাদের জন্য চরম কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এরা কোনো নিয়মনীতি মানে না, হাইওয়ের মাঝখান দিয়ে হুট করে লেন পরিবর্তন করে।
এদের কারণে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, আর বলী হচ্ছি আমরা সাধারণ শ্রমিকরা।’ অভিজ্ঞ বাসচালক মো. শহীদ সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দিকে আঙুল তুলে তীব্র ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সামনেই রাজকীয়ভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই সব অটোরিকশা ও সিএনজি। আমরা যখন ফুল স্পিডে গাড়ি নিয়ে আসি, তখন হঠাৎ করেই কোনো সিগন্যাল না দিয়ে এরা বড় গাড়ির সামনে চলে আসে। তখন হুট করে ব্রেক চাপলে বড় গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় বা রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে চালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন এবং বড় যানবাহনের শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা অকালে মারা যাচ্ছেন। দোষ হয় সব বড় গাড়ির চালকদের, কিন্তু আসল অপরাধী এই তিন চাকার অবৈধ গাড়িগুলো অধরাই থেকে যায়।’ পরিবহন খাতের বিনিয়োগকারী ও বড় যানবাহনের মালিক সিদ্দিক জানান, মহাসড়কে চলাচল করতে গিয়ে নিয়মিতই তাদের কোটি কোটি টাকা মূল্যের দূরপাল্লার গাড়িগুলো এই অবৈধ যানের কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার ফলে আমাদের বড় গাড়িগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একে তো যাত্রী নিরাপত্তা হুমকির মুখে, তার ওপর গাড়ি মেরামতের পেছনে লাখ লাখ টাকা ঢালতে হচ্ছে। লোকসান গুনতে গুনতে আমরা সাধারণ মালিকরা আজ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। পুলিশকে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।’ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশে তিন চাকার নিষিদ্ধ যানের কারণে ঠিক কী পরিমাণ জানমালের ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে স্থানীয় হাইওয়ে থানার সরকারি পরিসংখ্যানে।
এ বিষয়ে বরংগাইল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন আর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মহাসড়ক থেকে তিন চাকার ধীরগতির অবৈধ যানবাহন সরাতে আমরা আইনগতভাবে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে তাতে খুব একটা দীর্ঘমেয়াদি লাভ হচ্ছে না। আমরা নিয়মিত মামলা দিচ্ছি, গাড়ি ডাম্পিং করছি এবং জরিমানা করাসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি। এরপরও চালকরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন লিংক রোড ব্যবহার করে বিভিন্ন অজুহাতে আবারও মহাসড়কে তিন চাকার যান নিয়ে উঠে পড়ছেন।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীদের মতে, মহাসড়কে তিন চাকার যান বন্ধ না হওয়ার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও পরোক্ষ কারণ রয়েছে— বিকল্প সংযোগ সড়কের (সার্ভিস লেন) অভাব : ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে স্থানীয় ও ধীরগতির যান চলাচলের জন্য কোনো পৃথক সার্ভিস লেন নেই। ফলে স্থানীয় মানুষ এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা বাজারে যাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে এই মহাসড়কটি ব্যবহার করে।
সহজ কর্মসংস্থান ও ব্যাংক ঋণ : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজি সহজে কেনা যায় এবং এটি স্থানীয় বহু বেকার যুবকের আয়ের প্রধান উৎস। ফলে জীবিকার তাগিদে চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাইওয়েতে নামেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও পুলিশি সিন্ডিকেট : মহাসড়কের বিভিন্ন স্ট্যান্ডে এসব অবৈধ গাড়ি থেকে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে জিপি (গেটলক পাস) বা চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের পকেটে যায় বিধায়, তারা স্থায়ীভাবে এটি বন্ধ করতে আন্তরিক নন। সর্বোপরি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশে নিষিদ্ধ তিন চাকার যানের অবাধ চলাচল এবং এর ফলে ক্রমাগত প্রাণহানি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের যে বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা রুখতে হলে কেবল জোড়াতালির অভিযান বা নামমাত্র জরিমানা করে কোনো লাভ হবে না। বরংগাইল হাইওয়ে থানার ওসির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, প্রচলিত ব্যবস্থায় এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।