ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

মানবিক সংকটের গ্যাঁড়াকল রোহিঙ্গা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুন ২১, ২০২৬, ১২:৫০ এএম

মানবিক সংকটের গ্যাঁড়াকল রোহিঙ্গা

২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্মম নিপীড়ন, জাতিগত নিধন ও সহিংসতার মুখে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা। দেখতে দেখতে আজ প্রায় এক দশক বা ৯ বছরেরও বেশি সময় পার হতে চলেছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ তৎকালীন সময়ে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিয়ে মাদার অব হিউম্যানিটি বা মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তবে সময়ের আবর্তে এই সাময়িক মানবিক আশ্রয় এখন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল এবং প্রায় অলঙ্ঘনীয় স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের পক্ষে বছরের পর বছর ধরে প্রায় ১২ লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে (এফডিএমএন) টিকিয়ে রাখা যে কতটা অসম্ভব, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায়, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবারও অত্যন্ত জোরালো এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি স্পষ্ট করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের সাময়িক ত্রাণ বা পুনর্বাসন নয়, বরং তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও দ্রুত প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান।

নিউইয়র্ক সময় অনুযায়ী, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেশনে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

গতকাল শনিবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে ঢাকা ও বিশ্ব গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্রিফিংয়ে বক্তব্য প্রদানকালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের বাস্তব ও কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী তার বক্তব্যে একটি অত্যন্ত মৌলিক ও ঐতিহাসিক সত্য পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উৎপত্তি সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে। তারা শত বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছিল এবং তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।

সুতরাং, যেহেতু এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছে মিয়ানমারে, এর স্থায়ী, টেকসই এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানও মিয়ানমারের মাতিতেই খুঁজে বের করতে হবে। অন্য কোনো দেশে বা পদ্ধতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে নিজেদের ভূখণ্ডে রেখে দেয়ার ম্যান্ডেট বা সক্ষমতা রাখে না। সাময়িকভাবে আশ্রয় দেয়া এবং স্থায়ী নাগরিকত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে, তা বিশ্ব সমপ্রদায়কে বুঝতে হবে।

বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে কক্সবাজার ও ভাসানচরে যে অভূতপূর্ব নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ জাতিসংঘের সামনে পেশ করেন।

এই চতুর্মুখী চাপগুলো হলো— ক) অর্থনৈতিক ও আর্থিক চাপ: রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ প্রতি বছরই জ্যামিতিক হারে কমছে। ফলে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশের আর্থিক বোঝা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপর এসে পড়ছে। খ) সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় নাগরিকরা এখন নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন।

একই সাথে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী দলের উত্থান, মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস), মানব পাচার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে পুরো অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। গ) পরিবেশগত বিপর্যয়: ১২ লাখ মানুষের জ্বালানি ও বাসস্থানের জোগান দিতে গিয়ে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড় কেটে ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে।

সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী আন্তর্জাতিক অংশীদার, পরাশক্তি রাষ্ট্রসমূহ এবং জাতিসংঘের প্রতি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

সে গুলো হলো- অনুকূল পরিবেশ তৈরি: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যাতে রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যেতে পারে, সেই অনুকূল পরিবেশ গঠনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর বিশ্ব সমপ্রদায়ের কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে দীর্ঘশ্বাসের ৯ বছর: গতকাল ছিল বিশ্ব শরণার্থী দিবস।

যখন বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত ও নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত মানুষের অধিকার আর মানবিক মর্যাদা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়জুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের এক দীর্ঘশ্বাস। দেখতে দেখতে ৯টি বছর পার হয়ে গেলেও উখিয়া ও টেকনাফের কাঁটাতারের ঘেরাটোপে বন্দি ১২ লাখের (বাস্তবে প্রায় ১৫ লাখ) বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আজ পর্যন্ত তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেনি।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সামরিক জান্তার বর্বরোচিত ‘জাতিগত নিধন’ ও গণহত্যার মুখে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল এই বিশাল জনগোষ্ঠী। ৯ বছর ধরে ভিনদেশে অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা আর পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে কাটছে তাদের জীবন। সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক ত্রাণের পরিমাণ কমছে, ক্যাম্পের ভেতরে বাড়ছে অপরাধ আর নিরাপত্তা ঝুঁকি।

অথচ যে ‘প্রত্যাবাসন’ বা নিজ দেশে ফেরার কথা ছিল এই সংকটের একমাত্র সমাধান, তা আজ সম্পূর্ণ স্থবির। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে আর কতকাল এই বিপুল জনসংখ্যার ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকে, আর কতদিনই বা শরণার্থীরা কাটাবেন এই যাযাবর জীবন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির এই বক্তব্য অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও উদ্বেগের বাস্তব প্রতিফলন। বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে মানবিকতা প্রদর্শন করতে হয়, কিন্তু সেই মানবিকতার মাশুল হিসেবে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া যায় না।

এখন সময় এসেছে বিশ্ব সমপ্রদায়ের কথামালার রাজনীতি পেরিয়ে শক্ত কূটনৈতিক অ্যাকশনে যাওয়ার, যাতে করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সসম্মান এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। অন্যথায় এই আঞ্চলিক সংকট অচিরেই একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।

Link copied!