ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ

টিএম হুদা

টিএম হুদা

জুলাই ৩, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা বিবেচনায় নিলে এই লক্ষ্য অর্জনকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ক্লান্ত ও ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন।

বিশেষ করে সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমেই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দিতে তীব্র হিমশিম খাচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। ফলে জীবনযাত্রার মান টিকিয়ে রাখতে অনেক পরিবারকে তাদের দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসাও পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশের উচ্চ ঘরে পৌঁছেছিল। মে মাসের এই মূল্যস্ফীতির ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, শুধু চাল-ডাল বা নিত্যপণ্যের দামই নয়, বরং বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলোর খরচও সমান তালে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শহরের তুলনায় দেশের গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, সেখানে শহরে তা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই করছে, যা গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছে। মূল্যস্ফীতির এই ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির ফলে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি তৈরি হয়েছে তা হলো মানুষের প্রকৃত মজুরি বা ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় পর্যায়ে গড় মজুরি বা আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম, যার ফলে প্রথাগত অর্থে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে ধারের ঋণে জর্জরিত হতে কিংবা ব্যয়ের বিভিন্ন জরুরি খাতে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে বাধ্য করছে। মাছ, মাংস, দুধ বা ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার কেনা এখন সাধারণ পরিবারের ডায়েরিতে এক ধরনের বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানের এই লাগামহীন মূল্যস্ফীতির পেছনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক একাধিক কারণ একসাথে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের আমদানি ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরপরই বিদ্যুতের দামও নতুন করে সমন্বয় করায় শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সেবাখাতের উৎপাদন ও পরিচালনা ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ যেহেতু প্রায় সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের প্রধান চালিকাশক্তি, তাই এর দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব জুন ও জুলাই মাসে বাজারে আরও জোরালোভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেচের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, যার চূড়ান্ত ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এনে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।

সরকার এই লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং খুচরা বাজারে নিয়মিত তদারকি বা অভিযানের মতো বিভিন্ন প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বা খুচরা বাজারে এখনো এর কোনো দীর্ঘমেয়াদি দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, খুচরা বাজারে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান করা হলেও বড় আমদানিকারক, পাইকারি আড়ত এবং শক্তিশালী করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর ওপর কার্যকর ও কঠোর নজরদারি এখনো যথেষ্ট দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা এবং সরবরাহ চেইনের অভ্যন্তরীণ চাঁদাবাজি ও অদক্ষতা পণ্যের দামকে কৃত্রিমভাবে উসকে রাখছে।

সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কারণ বাজেট নথির তথ্যানুযায়ী আগামী অর্থবছরেও তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করা হতে পারে। এমন বাস্তবতায় শুধু সুদের হার বাড়িয়ে কিংবা কঠোর মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নামিয়ে আনতে হলে সুদের হারের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা দূর করা, চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। একই সাথে নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। ফলে আগামী মাসগুলোতে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে, কারণ বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি।

Link copied!