ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬

তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের ধাক্কা

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুলাই ২, ২০২৬, ১২:৫০ এএম

তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের ধাক্কা

তীব্র দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের নতুন ধাক্কা সাধারণ মানুষকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃতির প্রচণ্ড উত্তাপ আর বিদ্যুতের অসহনীয় লুকোচুরি মিলে দেশের জনজীবনকে এক স্থবিরতার বৃত্তে বন্দি করে ফেলেছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সংকেত দিচ্ছে।

এই অস্বাভাবিক গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কেবল যাতায়াত বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না, বরং এটি জনস্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের মানসিক ধৈর্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে সাভার, গাজীপুর এবং মফস্বল অঞ্চলগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা যেন সহনীয়তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি অস্থিতিশীলতা এবংবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি জটিলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, লোডশেডিংয়ের এই বণ্টনপ্রক্রিয়া।

নগরকেন্দ্রিক কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎহীনতার চিত্র ভয়াবহ। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষিনির্ভর ব্যবসাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয় ও জীবিকার ওপর।

এই পরিস্থিতিতে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিসের সামনে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি চরম ভোগান্তির বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় জরুরি সেবা প্রদান করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই পুনরাবৃত্তি নাগরিক সেবার মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, নিয়মিত বিল পরিশোধ করা সত্ত্বেও এমন ‘বৈষম্যমূলক’ লোডশেডিং তাদের অধিকারের পরিপন্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নিরসনে কেবল উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং বিদ্যুৎ বণ্টনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। গ্রাম ও শহরের মধ্যে এই কৃত্রিম বৈষম্য নিরসন না করলে পরিস্থিতির উত্তরণ অসম্ভব। জনগণ এখন কেবল আশ্বাসের বাণী শুনতে চায় না; তারা চায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার টেকসই সমাধান এবং গরমের এই দুঃসময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।

রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা সহনশীলতা দেখা গেলেও দেশের গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল শহরগুলোতে চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রচণ্ড গরমে দিনের বড় একটা সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুতের এই নজিরবিহীন লোডশেডিং সরাসরি আঘাত করছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর। বিদ্যুৎনির্ভর কারখানা ও দোকানপাট দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দোকান ভাড়া তোলা দায় হয়ে পড়েছে। প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ ঠিকই দিতে হয়, অথচ বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।’

সাভার বা ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার মতোই দেশের অন্যান্য জেলায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধ, আবার কোথাও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের মতো উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার মধ্যরাতে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে এক উদ্বেগজনক নজির।

বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের পেছনে মূল কারণগুলো হলো— চাহিদা বৃদ্ধি: তীব্র গরম এবং চলমান বিভিন্ন ইভেন্টের (যেমন বিশ্বকাপ) কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। জ্বালানি সংকট: তেল ও গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে ৬৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি জটিলতা: রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সংকটাপন্ন করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না।

বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ জানিয়েছেন, ইউটিলিটিগুলোর সাথে বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্যমূলক বণ্টনের নীতি মানুষের অসন্তোষের মূল কারণ।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, এই অসমতা ও বৈষম্য মানবাধিকারবিরোধী। লোডশেডিং যদি সমানভাবে বণ্টন করা হতো, তবে মানুষের ক্ষোভ এতটা প্রকট হতো না। বিদ্যুৎ না দিয়েও গ্রাহকদের কাছ থেকে ‘ডিমান্ড চার্জ’ আদায় করা চরম অন্যায়। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও সরবরাহ সীমাবদ্ধ থাকছে ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে।

চাহিদার তুলনায় এই বিশাল ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। তবে গ্রাহকদের দাবি, বিদ্যুৎ বিভাগ যেন কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বণ্টন বৈষম্য দূর করে এবং দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকটের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বণ্টনের সমতা রক্ষা করতে না পারা।

নগরকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা পরিবর্তন করে দেশের প্রতিটি প্রান্তের নাগরিককে সমান সুবিধা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিদ্যুৎ সংকট একটি সাময়িক সমস্যা হতে পারে, কিন্তু বৈষম্যমূলক আচরণ দীর্ঘমেয়াদে জনমনে যে আস্থার সংকট তৈরি করছে, তা দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। আশার কথা হলো, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি খাতের সংস্কারের মাধ্যমে এই দুর্দিন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, যার অপেক্ষায় সমগ্র দেশবাসী।

Link copied!