নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই ৪, ২০২৬, ১২:৫৬ এএম
ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ ও প্রাণহানি যেন ক্রমেই এক ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের উপচেপড়া ভিড় এবং প্রতিদিনের মৃত্যুসংবাদ জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম অসন্তোষ ও অভিযোগ রয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে মশা নিধন যে যথেষ্ট নয়, তা এখন অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মুগদা ও যাত্রাবাড়ীর মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে মশার উপদ্রব এখন চরমে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব এলাকায় মশা নিধনকারী ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে, সেগুলো মশা বা লার্ভা মারতে ব্যর্থ হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় স্প্রে করার কোনো লক্ষণই নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিস মশার লার্ভা এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘কীটনাশক রেজিস্ট্যান্ট’ হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মশা বা লার্ভা সেই ওষুধের প্রতি এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘শুধু রাসায়নিক স্প্রে করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কীটনাশকের কার্যকারিতা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা জরুরি এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’ মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার দায় কেবল কর্তৃপক্ষের নয়, এক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবন মালিকরা ছাদবাগান পরিষ্কার রাখছেন না, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমিয়ে রাখছেন যা এডিস মশার বংশবিস্তারের আদর্শ ক্ষেত্র।
একদিকে সরকারি অবহেলা ও ওষুধের নিম্নমান, অন্যদিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের অসচেতনতা এই দুয়ের সমন্বয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানের প্রচলিত রাসায়নিক বা স্প্রে দিয়ে যেসব লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের দমনে সরকার উচ্চমাত্রার এক বিশেষ ট্যাবলেট নিয়ে আসছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এই ট্যাবলেট মাঠে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের হাসপাতালের পূর্ণ সুস্থতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ছাড়পত্র না দেয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় কয়েকটি মৌলিক পরামর্শ দিয়েছেন- ১. সমন্বিত উদ্যোগ : কেবল সিটি কর্পোরেশনের ওপর নির্ভর না করে কমিউনিটি পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা। ২. পরীক্ষাগার ভিত্তি : ব্যবহূত কীটনাশকগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা। ৩. জনসচেতনতা : নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার জন্য নাগরিকদের কঠোরভাবে উদ্বুদ্ধ করা।
ডেঙ্গু এখন কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। সরকার যে বিশেষ ট্যাবলেট ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে, তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল এই ট্যাবলেটই সমাধান নয়। মশা নিধন কার্যক্রমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ, সঠিক তদারকি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে এই প্রাণঘাতী সংকট থেকে রাজধানীবাসীকে মুক্তি দিতে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, তবে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের যথাযথ ও দ্রুত বাস্তবায়নই হবে ডেঙ্গু জয়ের মূল চাবিকাঠি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নতুন ওষুধ আনছে ডিএনসিসি : ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে মশার লার্ভা ধ্বংসে ব্যবহূত ওষুধ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। দীর্ঘদিন একই ধরনের লার্ভানাশক ব্যবহারের ফলে এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে নতুন ও অধিক কার্যকর ওষুধ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বনানী এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচালিত বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এ তথ্য জানান। ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না; ব্যবহূত ওষুধের কার্যকারিতাও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। দীর্ঘ সময় একই ধরনের লার্ভানাশক ব্যবহার করায় মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন ওষুধ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন লার্ভানাশক সংগ্রহের বিষয়ে কাজ করছি। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে কার্যকর ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হবে।’
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বিষয়ে বিশেষ নজরদারির কথাও জানান শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ডিএনসিসির স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাসায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে রোগীর বাসার আশপাশে এডিস মশার প্রজননস্থল আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীর বাড়ির আশপাশে দ্রুত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলে সংক্রমণের বিস্তার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সিটি কর্পোরেশনের ওপর নির্ভর করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এডিস মশা খুব অল্প পরিমাণ পরিষ্কার পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। তাই বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, অব্যবহূত পাত্র, টায়ার, পানির ট্যাংক এবং অন্যান্য স্থানে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’ ডিএনসিসি প্রশাসক দাবি করেন, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার এবং নির্মাণাধীন ভবন বর্তমানে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রজননের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং জমে থাকা পানির কারণে এসব এলাকায় লার্ভার বিস্তার ঘটছে।
তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, আবাসন কর্তৃপক্ষ এবং নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজেদের স্থাপনায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণকাজে ব্যবহূত খোলা পাত্র, ড্রাম কিংবা অন্য স্থানে যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডিএনসিসি নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করবে। যারা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। বনানীতে পরিচালিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানে সড়ক, ড্রেন, খালসংলগ্ন এলাকা এবং সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল পরিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয় এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে লিফলেট বিতরণ করা হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি নগরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন ডিএনসিসি প্রশাসক।
তিনি জানান, গুলশান-বারিধারা খালে গিয়ে পড়া বিভিন্ন সংযোগ অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, খালে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য পড়ার কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার সমস্যাও বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে সুয়ারেজ লাইন স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
তার মতে, কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নগরের পরিবেশ যেমন উন্নত হবে, তেমনি ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি উৎসস্থল নির্মূল করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তাদের মতে, রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। এতে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। ডিএনসিসি জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুমজুড়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। নিয়মিত মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং আক্রান্ত এলাকা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে।
সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, নিজেদের বাড়ি, অফিস, ছাদ ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি কোথাও এডিস মশার প্রজননস্থল দেখা গেলে দ্রুত সিটি কর্পোরেশনকে জানাতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, প্রশাসন ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই ডেঙ্গুর বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।