আমার সংবাদ ডেস্ক
মে ২১, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
রাজধানীর রামপুরা থানা এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার প্রধান আসামি মো. শিহাব হোসেনকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত শিহাব ওই মাদ্রাসারই একজন শিক্ষার্থী। ঘটনার পর পরই সে ঢাকা থেকে পালিয়ে পাবনায় নিজের গ্রামের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিল। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় রামপুরা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শিশুটির রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে। ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ ও মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) রাতে রামপুরা থানা এলাকার ওই মাদ্রাসার একটি কক্ষ থেকে ১০ বছর বয়সী ওই শিশু শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ ও অন্য শিক্ষার্থীরা লাশটি ঝুলতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে রামপুরা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিকভাবে বিষয়টি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চোখে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সন্দেহজনক আলামত ধরা পড়ে। মৃত শিশুটির শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে সুরতহাল প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তারা স্পষ্ট ইঙ্গিত পান যে, মৃত্যুর আগে শিশুটি চরম পাশবিকতা এবং অস্বাভাবিক যৌনাচারের (বলাৎকার) শিকার হয়েছিল। এই আলামত পাওয়ার পর পরই পুলিশের তদন্তের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায় এবং এটি সাধারণ কোনো আত্মহত্যা নয়, বরং এর পেছনে গভীর কোনো অপরাধ লুকায়িত আছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়। সুরতহাল প্রক্রিয়া শেষ করে আইনি নিয়ম মেনে শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মাদ্রাসার মতো একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজের ১০ বছরের সন্তানের এমন করুণ ও মর্মান্তিক পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না হতভাগ্য মা। পুলিশের কাছ থেকে আলামতের বিবরণ শোনার পর তিনি নিশ্চিত হন যে, তার সন্তানকে মাদ্রাসার ভেতরেই কোনো নরপশু চরমভাবে নির্যাতন করেছে।
এই ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একই মাদ্রাসার বড় ছাত্র মো. শিহাব হোসেনের নাম উল্লেখ করে এবং अज्ञातনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, তার শিশু সন্তানকে জোরপূর্বক ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অস্বাভাবিক ও নৃশংস যৌনাচারে বাধ্য করা হয়েছে। এই চরম মানসিক ট্রমা, শারীরিক যন্ত্রণা এবং লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচতে শিশুটি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে সরাসরি বলাৎকার এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানান, ১৯ মে রাতে যখন মাদ্রাসা থেকে শিশুটির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তার ঠিক পূর্বমুহূর্তেই কৌশলে মাদ্রাসা ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ১৯ বছর বয়সী তরুণ শিহাব হোসেন। সাধারণ কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ গভীর রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
রামপুরা থানা পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে শিহাব ঢাকার বাইরে চলে গেছে। এরপর দ্রুত তার স্থায়ী ঠিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শিহাব পাবনায় তার নিজ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেছে। এরপর রামপুরা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল পাবনায় ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে শিহাবকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে আসে।
পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছি। সে কেন ঘটনার রাতে কাউকে না জানিয়ে দ্রুত ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে গেল, সেই বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সাথে এই পৈশাচিক ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
নৃশংস এই ঘটনার পর রামপুরা থানা পুলিশ ওই মাদ্রাসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং অন্যান্য পরিচালনা কমিটির সদস্যদের থানায় ডেকে এনে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। মাদ্রাসার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে তাদের অবহেলা ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে মাদ্রাসার শিক্ষকেরা পুলিশের কাছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তারা স্বীকার করেছেন যে, গ্রেপ্তারকৃত শিহাব হোসেনের চরিত্র ও আচরণ মোটেও ভালো ছিল না। এর আগেও মাদ্রাসার ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে অস্বাভাবিক যৌনাচার ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ছিল শিহাবের বিরুদ্ধে। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো শাস্তিমূলক বা আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কি না, এখন সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মাদ্রাসার ভেতরের পরিবেশ এবং পূর্ববর্তী অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করা হচ্ছে। যদি কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি বা অপরাধ আড়াল করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই জঘন্য অপরাধের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নিহত শিশুটির মা অত্যন্ত জোরালোভাবে সন্দেহ করছেন যে তার সন্তানকে নির্মমভাবে ধর্ষণ বা বলাৎকার করা হয়েছে এবং সেই তীব্র মানসিক যন্ত্রণার ক্ষত সহ্য করতে না পেরেই সে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। সুরতহাল রিপোর্টেও আমরা কিছু অস্বাভাবিক আলামত পেয়েছি যা মায়ের এই সন্দেহকে বহুলাংশে সমর্থন করে।
ওসি আরও জানান, আইনি প্রক্রিয়াকে নিশ্ছিদ্র করতে আমরা এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের फॉरেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের (অটোপসি রিপোর্ট) জন্য অপেক্ষা করছি। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত এবং ফরেনসিক বা ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট হাতে এলেই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে যে মৃত্যুর ঠিক কতক্ষণ আগে এবং কীভাবে শিশুটির ওপর এই যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনে এই মামলায় আরও কঠোর ধারা যুক্ত করা হবে।
রাজধানীর বুকে একের পর এক শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মধ্যেই রামপুরার এই মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। মাত্র চার ঘণ্টা আগে পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক শিশুকে ধর্ষণের পর খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে যখন তোলপাড় চলছে এবং আইনমন্ত্রী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক তখনই রামপুরার এই ঘটনাটি সামনে এলো।
মানবাধিকার কর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তা সাধারণ স্কুল হোক কিংবা ধর্মীয় মাদ্রাসা, সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে ছোট শিশুদের ওপর বড় ছাত্রদের কিংবা শিক্ষকদের দ্বারা এ ধরনের বিকৃত ও অস্বাভাবিক যৌনাচারের ঘটনা মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানহানির ভয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা এই বিষয়গুলো ধামাচাপা দেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় রামপুরার এই ১০ বছরের শিশুর আত্মহত্যার মতো ট্র্যাজেডিতে।
রামপুরা থানা পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, এই মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করা হচ্ছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক কিংবা এর পেছনে যত বড় সিন্ডিকেটই থাকুক না কেন, নিস্পাপ শিশুটির আত্মহত্যার পেছনে দায়ী মূল হোতা শিহাবসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। এলাকার বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারাও অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং মাদ্রাসার ভেতরে শিশুদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এম জি/জেএইচআর