নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ১১, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত নতুন বাজেট এক মিশ্র বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা কিছুটা বাড়িয়ে সীমিত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে করের ধাপ বা ট্যাক্স স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের কারণে উচ্চতর আয়ের ক্ষেত্রে করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে যে বাজেট পেশ করেছেন, তাতে করকাঠামোতে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে- যা আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত কার্যকর রাখার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমার নতুন বিন্যাস, কার জন্য কেমন সুবিধা?
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর যে প্রাথমিক নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিয়েছিলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার নতুন বাজেটে তা অক্ষুণ্ণ রেখে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনা করে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন বাজেট অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা যেভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিচে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো।
করমুক্ত আয়সীমার তুলনামূলক চিত্র অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, সাধারণ করদাতাদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী করমুক্ত সীমা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা বাড়িয়ে নতুনভাবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা (পৌনে চার লাখ) নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পূর্বে এই সীমা ছিল ৪ লাখ টাকা, যা এখন বাড়িয়ে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা (সোয়া চার লাখ) করা হয়েছে।
অন্যদিকে তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে পূর্বের করমুক্ত সীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা (সোয়া ৫ লাখ) করা হয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসমূহের পিতা-মাতা কিংবা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্য কর রেয়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হয়েছে। এমন করদাতাদের প্রতি সন্তানের (বা পোষ্যের) জন্য বিদ্যমান করমুক্ত সীমার বাইরে অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা করে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে।
কর হারের পুনর্বিন্যাস ৫ শতাংশের স্তর বিলুপ্ত ও নতুন গণিত
এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি এসেছে করের হার বা স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে করমুক্ত সীমার ঠিক পরবর্তী আয়ের ওপর ৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার যে নিয়ম চালু ছিল, তা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এই ৫ শতাংশের স্তরটি উঠে যাওয়ার কারণে কর গণনার পুরো সমীকরণটি বদলে গেছে, যা মধ্যম ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী করমুক্ত সীমার (পৌনে চার লাখ টাকা) পরবর্তী আয়ের ওপর করের হার ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে। এর পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর ধার্য করা হবে। এরপরের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে করের হার হবে ২০ শতাংশ। পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ কর দিতে হবে। আর অবশিষ্ট যেকোনো পরিমাণ আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য হবে।
ধরা যাক, একজন সাধারণ করদাতার বার্ষিক আয় যদি পৌনে চার লাখ টাকার বেশি হয়, তবে করমুক্ত সীমা পার হওয়ার পর প্রথম ৩ লাখ টাকার জন্যই তাঁকে সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগে যেখানে প্রথম ১ লাখ টাকার জন্য মাত্র ৫ শতাংশ কর দিতে হতো, সেই সুবিধাটি এখন আর থাকছে না। ফলে করের ভিত্তি বাড়লেও করদাতার পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া টাকার পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।
রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা সারা বছর রিটার্ন ও প্রান্তিকভিত্তিক পুরস্কার-জরিমানা
কর সংস্কৃতির আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে সরকার কর প্রদানের নিয়মে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে করদাতারা নির্দিষ্ট সময়সীমার বেড়াজালে আটকে না থেকে বছরের যেকোনো সময় (সারা বছর) আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। তবে করদাতাদের দ্রুত কর দিতে উৎসাহিত করার জন্য চার জোড়া প্রান্তিক বা কোয়ার্টারে পুরস্কার ও জরিমানার এক অভিনব মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
১. প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশেষ প্রণোদনা
অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন, তারা সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক ছাড় পাবেন। এ ক্ষেত্রে মোট পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ২৫,০০০ টাকা- এই দুটির মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ টাকা করছাড় বা রেয়াত হিসেবে পাওয়া যাবে। এটি মূলত সৎ ও নিয়মকানুন মেনে চলা করদাতাদের পুরস্কৃত করার একটি প্রয়াস।
২. দ্বিতীয় প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সাধারণ সময়
এই সময়ে রিটার্ন দিলে কোনো বাড়তি লাভও হবে না, আবার কোনো ক্ষতি বা জরিমানাও হবে না। করদাতার হিসাবে ঠিক যতটুকু কর আসবে, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী শুধু সেই পরিমাণ টাকাই পরিশোধ করতে হবে।
৩. তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) বিলম্বের মাশুল
বছরের মাঝামাঝি পার হয়ে এই সময়ে রিটার্ন জমা দিলে করদাতাকে উল্টো বাড়তি টাকা গুণতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিশোধযোগ্য করের চেয়ে অতিরিক্ত ২ শতাংশ অথবা ৩,০০০ টাকা- যেটি অঙ্কে বেশি হবে, সেই পরিমাণ অর্থ জরিমানা বা বাড়তি কর হিসেবে দিতে হবে।
৪. চতুর্থ প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) সর্বোচ্চ জরিমানা
অর্থবছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে যারা রিটার্ন দেবেন, তাদের জন্য জরিমানার পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ। এ ক্ষেত্রে পরিশোধযোগ্য করের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ অথবা ৫,০০০ টাকা- যেটি পরিমাণে বেশি, সেই অর্থ জরিমানা হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার আয়নায় করদাতার প্রকৃত অবস্থা
কাগজে-কলমে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হলেও, সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বা প্রকৃত আয় , কিন্তু গত কয়েক বছরে বেশ সংকুচিত হয়েছে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের বাজেটে সর্বশেষ করমুক্ত সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় এটি অপরিবর্তিত ছিল।
বিগত তিন বছর ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির যে তাণ্ডব চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হওয়ার কারণে মানুষের হাতে থাকা টাকার মান বা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় করে কোনোমতে সংসার চালাতেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এখন তাঁর জীবনধারণের খরচ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। ফলে করমুক্ত সীমা মাত্র ২৫,০০০ টাকা বাড়ানো হলেও, তা মূল্যস্ফীতির প্রকৃত ক্ষতিকে পুরোপুরি পুষিয়ে নিতে পারছে না। ফলে যেসব করদাতা করমুক্ত সীমার ঠিক সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন, তাঁদের জীবনযাত্রার খরচ নির্বাহ করার পর কর পরিশোধ করাটা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।
টিআইএন ধারী বনাম প্রকৃত করদাতার বিশাল ব্যবধান
নতুন বাজেটের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং করের হিসাব-নিকাশ দেশের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) ধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য এই সংখ্যাটি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এর পেছনের প্রকৃত সত্যটি বেশ চিন্তার।
এই ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএন ধারীর মধ্যে প্রতিবছর মাত্র ৪০ থেকে ৪২ লাখ মানুষ প্রকৃত অর্থে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি টিআইএন ধারী এখনো কর জালের বাইরে রয়ে গেছেন অথবা তারা রিটার্ন জমা দেন না। এই ৪০-৪২ লাখ নিয়মিত করদাতাকেই প্রতিবছর নতুন নতুন আইন মেনে, করমুক্ত আয়সীমা এবং করের হার নিখুঁতভাবে হিসাব করে নিজেদের আয়-ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হয়। সরকারের এবারের লক্ষ্য হচ্ছে করের হার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই নিয়মিত করদাতাদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং একই সাথে সারা বছর রিটার্ন জমার সুযোগ দিয়ে অনিয়মিতদের কর জালে আনা।
নীতিমালার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই আয়কর নীতিমালার মূল দর্শন হলো একদিকে প্রান্তিক ও বিশেষ শ্রেণির মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, অন্যদিকে উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর করের হার বাড়িয়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা। ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত এই করমুক্ত সীমা অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় করদাতারা আগামী দুই বছর নিজেদের আর্থিক পরিকল্পনা সুনির্দিষ্টভাবে সাজাতে পারবেন।
তবে ৫ শতাংশের করের ধাপটি তুলে দেওয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর যে প্রচ্ছন্ন করের চাপ তৈরি হলো, তা বাজারমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির সময়ে কতখানি সহনীয় হবে, তা সময়ই বলে দেবে। সরকারের উচিত হবে কর আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো, যাতে অল্প কিছু মানুষের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে বিশাল টিআইএন ধারী জনগোষ্ঠীর সবাইকে কর ব্যবস্থার মধ্যে আনা সম্ভব হয়।
এএন