আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ২২, ২০২৬, ১১:০৩ এএম
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধ ছাপিয়ে ইরান ও ইসরায়েল এখন সরাসরি এক প্রলয়ঙ্কারী সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে।
শনিবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলের অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহর লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তেহরানের দাবি, এই হামলায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চরম আলটিমেটাম জারি করেছেন, যা পুরো সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শনিবার মধ্যরাত থেকে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'আয়রণ ডোম'কে ফাঁকি দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল ধেয়ে আসতে থাকে। আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবার তারা তাদের সবচেয়ে আধুনিক 'ফাত্তাহ' হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার করেছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল তেল আবিব, হাইফা, বিরশেবা, আশদোদ এবং জেরুজালেমের সামরিক স্থাপনাগুলো।
তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, শত্রুরাষ্ট্রের সামরিক সদরদপ্তর ও গোয়েন্দা কেন্দ্রগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দখলদার বাহিনীর অন্তত ২০০ জন সদস্য নিহত হয়েছে এবং শত শত আহত হয়েছে।
যদিও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছে, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার ফুটেজে ইসরায়েলি শহরগুলোর আকাশে আগুনের গোলা এবং ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা গেছে।
ইসরায়েলের ওপর এই হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ওয়াশিংটন থেকে ভেসে এলো কঠোর হুঁশিয়ারি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশেষ বার্তায় ইরানকে স্পষ্ট আলটিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্পের মূল উদ্বেগের জায়গা হলো 'হরমুজ প্রণালী'। ইরান এই প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর আলটিমেটামে বলেছেন, ইরানকে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও নিরাপদ করতে হবে। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর কোনো আঘাত সহ্য করা হবে না। ট্রাম্পের এই হুমকির পর প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের হাতে আসলে আর কত সময় আছে? সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এর মধ্যে ইরান তাদের অবস্থান থেকে সরে না আসে, তবে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি পারস্য উপসাগরে অভিযানে নামতে পারে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এই সরু হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়। ইরান বারবার এই জলপথকে তাদের 'তুরুপের তাস' হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তেহরানের কৌশল হলো, যদি তাদের ওপর বড় কোনো হামলা হয়, তবে তারা এই প্রণালীটি মাইন বিছিয়ে বা সামরিক জাহাজ দিয়ে বন্ধ করে দেবে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এই আশঙ্কা থেকেই ইরানকে দেয়ালের পিঠে পিঠ ঠেকানোর পরিকল্পনা করছে।
ইরানের এই বিশাল হামলার পর আঞ্চলিক শক্তিগুলোও নড়েচড়ে বসেছে। জর্ডান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো তাদের আকাশসীমা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের এই পদক্ষেপকে 'ঐতিহাসিক বিজয়' হিসেবে অভিহিত করে সর্বাত্মক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান আজ রাতে একটি বড় ভুল করেছে এবং এর মাসুল তাদের দিতে হবে। ইসরায়েল এখন কি কেবল ইরানের প্রক্সি যোদ্ধাদের ওপর হামলা চালাবে, নাকি সরাসরি তেহরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানবে, সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
এই সংঘাতের খবরে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। হামলার খবর আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে যে, এটি হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। তেহরান থেকে তেল আবিব, সবখানেই এখন সাধারণ মানুষের চোখেমুখে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের ছাপ।
২০২৬ সালের এই মার্চ মাসটি ইতিহাসের পাতায় এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। ইরানের হামলা এবং ট্রাম্পের আলটিমেটাম, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন আইসিইউতে। কূটনীতির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন কেবল অস্ত্রের ভাষাই প্রবল হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয়, ইরান কি ট্রাম্পের আলটিমেটামের কাছে নতি স্বীকার করবে, নাকি হরমুজ প্রণালীর দখল নিয়ে এক চূড়ান্ত মহাপ্রলয়ের দিকে পা বাড়াবে।
জেএইচআর