আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মে ১৩, ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে আজ রাজা চার্লসের ঐতিহাসিক ‘কিংস স্পিচ’ বা রাজকীয় ভাষণ, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের গদি রক্ষার মরণপণ লড়াই।
সরকারের নতুন আইন প্রণয়নের রূপরেখা ঘোষণার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ডাউনিং স্ট্রিটে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সাথে স্টারমারের বৈঠক রাজনৈতিক মহলে নতুন গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে। কিংস স্পিচের আগে রুদ্ধদ্বার বৈঠক আজ সকালে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিংস স্পিচে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং নতুন আইনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য এই বৈঠক আয়োজিত হলেও, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
ওয়েস স্ট্রিটিংকে বর্তমানে লেবার পার্টির ভেতর স্টারমারের অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলের ভেতরে যখন স্টারমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হচ্ছে, তখন স্ট্রিটিংয়ের সাথে এই বৈঠককে 'ক্ষমতার ভারসাম্য' বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কিংস স্পিচ: সরকারের টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ
আজ রাজা চার্লস পার্লামেন্টে সরকারের পরবর্তী মেয়াদের আইনি এজেন্ডা বা 'লেজিসলেটিভ প্রোগ্রাম' তুলে ধরবেন। এতে স্থান পেতে পারে:
অর্থনৈতিক সংস্কার: জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা।
স্বাস্থ্যসেবা: এনএইচএস (NHS) বা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে নতুন বিল।
পরিবেশ ও হাউজিং: আবাসন সংকট সমাধানে নতুন নীতিমালা।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, রাজা যে আইনের রূপরেখা দেবেন, স্টারমার কি তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদে টিকে থাকবেন? রাজার ভাষণ ব্রিটিশ রাজনীতির একটি নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতা হলেও, স্টারমারের জন্য এটি এখন রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
দলে বিদ্রোহ ও পদত্যাগের হিড়িক
মঙ্গলবার থেকে লেবার পার্টির ভেতরে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। স্টারমারকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে তার মন্ত্রিসভায়।
চার মন্ত্রীর পদত্যাগ: মঙ্গলবার চারজন মন্ত্রী তাদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন, যা স্টারমারের কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।
৮০ জন এমপির অনাস্থা: অন্তত ৮০ জন লেবার এমপি এখন পর্যন্ত স্টারমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করার অথবা পদ ছাড়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (টাইমটেবল) ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিদ্রোহী এমপিদের দাবি, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে দলের জনসমর্থন কমছে এবং সামনের সাধারণ নির্বাচনে জেতা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বিদ্রোহের আগুনের বিপরীতে স্টারমারের প্রতি অনুগত এমপিরাও নীরব নেই। প্রায় ১০০ জনেরও বেশি লেবার এমপি একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন যেখানে তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
তাদের মতে, এটি কোনো নেতৃত্বের লড়াইয়ের সময় নয়। দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে স্টারমারের ওপর আস্থা রাখা জরুরি।
এই সমর্থন স্টারমারকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও দলের অভ্যন্তরীণ ফাটল এখন স্পষ্ট। একদিকে সংস্কারপন্থীরা পরিবর্তনের দাবি তুলছেন, অন্যদিকে অনুগতরা স্থায়িত্বের পক্ষে লড়ছেন।
স্টারমার এখন পর্যন্ত পদত্যাগের সব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কাজ চালিয়ে যেতে চান। কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে যখন খোদ নিজ দলের মন্ত্রী ও এমপিরা বিদ্রোহ শুরু করেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কতদিন টিকে থাকে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
লন্ডনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন স্টারমারের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। স্ট্রিটিংয়ের সাথে আজকের বৈঠকের ফলাফল এবং কিংস স্পিচের পরবর্তী জনমতই ঠিক করে দেবে ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী চাবি কার হাতে থাকবে।
এএন