ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

জন্মশহরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জুলাই ৯, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম

জন্মশহরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

আধুনিক ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রভাবশালী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শাসনক্ষমতা, সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তিনি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে তিনি এক অতি পরিচিত নাম। 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর আজ তাঁর শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। তাঁর জন্মশহর এবং শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র স্থান মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এই কিংবদন্তি নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইরানের প্রতিটি প্রান্ত থেকে লাখো শোকাহত মানুষ মাশহাদে সমবেত হন। নজিরবিহীন জনসমাগম এবং বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কিছুটা পরিবর্তন এনে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ইমাম রেজা স্ট্রিট থেকে মূল জানাজার শোকযাত্রা শুরু হয়। 

সকাল থেকেই মাশহাদের সড়কগুলোতে অবস্থান নেওয়া লাখ লাখ মানুষের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং মার্কিন-ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। মাশহাদের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নাইজেরিয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।

মাশহাদে দাফনের আগে খামেনির মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ইরাকে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে শিয়া ঐতিহ্যের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে ঐতিহাসিক শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়। ইরাকি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, নাজাফে প্রথম শিয়া ইমাম হযরত আলী (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ তাঁর কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

এরপর বিখ্যাত ‘আরবাঈন রুট’ হয়ে মরদেহ কারবালায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত আব্বাসের মাজারের পাশেও লাখো মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাসে বিদেশি শত্রুর হামলায় মৃত্যুকে ‘শাহাদাত’ হিসেবে গণ্য করায় খামেনির এই চলে যাওয়া ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে বিশাল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতীকী গুরুত্ব লাভ করেছে।

গত ৩ জুলাই থেকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ৪ ও ৫ জুলাই বিশেষ শোকানুষ্ঠান এবং ৬ জুলাই লাখো মানুষের উপস্থিতিতে মূল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৭ জুলাই কোমের জামকারান মসজিদ এবং ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ ও কারবালা ঘুরে মরদেহ মাশহাদে আনা হয়।

এই দীর্ঘ শোকযাত্রায় বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ৯০টির বেশি দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিক্ষুব্ধ জনতার একাংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে এবং এই হত্যাকাণ্ডের কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াবহ হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন এবং তাঁর মুখমণ্ডল ও শরীর মারাত্মক জখম হয় বলে ইরানি সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন থাকা এবং কঠোর নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। 

নতুন নেতা হিসেবে তিনি লিখিত বার্তা পাঠালেও এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রভাবশালী সামরিক সংগঠন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পূর্ণ সমর্থনে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং খামেনির মৃত্যুর পর আইআরজিসি-ই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ফিরে দেখা খামেনির রাজনৈতিক জীবন

১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদ শহরের এক সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেন আলী খামেনি। কৈশোরে মাশহাদ ও কোমের বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির প্রশ্চিমাঘেঁষা একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে গোপন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এই কারণে বহুবার তাঁকে কারাবরণ ও নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে হয়। 

১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ শাসনের পতন ঘটলে খামেনি নতুন সরকারের অংশ হন এবং বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে এক প্রকাশ্য সভায় বোমা হামলায় তাঁর ডান হাতটি স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। একই বছর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিহত হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এক নাটকীয় পটপরিবর্তনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসেন আলী খামেনি। দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনামলে তিনি অনেক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির উদার নীতি এবং ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ খামেনির ক্ষমতার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এছাড়া ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের কারণেও তিনি তীব্র চাপের মুখে পড়েন। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তুলতে সক্ষম হন, যার মাধ্যমে সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরানের গভীর সামরিক ও আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

২০১৩ সালে হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর খামেনির পরোক্ষ অনুমতিতে পশ্চিমাদের সাথে পারমাণবিক চুক্তির আলোচনা শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে ছয় পরাশক্তির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বের হয়ে গেলে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও তলানিতে ঠেকে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজা ও লেবানন পরিস্থিতির জেরে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে সরাসরি মিসাইল হামলা চালায় ইরান। 

এর প্রতিশোধ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামের এক বড় বিমান হামলা চালায়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অধীনে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ৯ শতাধিক বিমান হামলা চালালে খামেনিসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য নিহত হন, যার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে আধুনিক ইরানের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের।

Link copied!