নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে ঘরে এনেছিলেন অসহায় এক শিশুকে। আশ্বাস দিয়েছিলেন পড়াশোনা করিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু সেই আশ্রয়ই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো এক পৈশাচিক নরককুণ্ডে। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মো. সাফিকুর রহমানের বাসায় লোমহর্ষক নির্যাতনের শিকার হয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে এক শিশু গৃহকর্মী।
২০২৫ সালের জুনে অভাবের তাড়নায় এক মা তাঁর শিশুকন্যাকে ভালো জীবনের আশায় ড. সাফিকুর রহমানের বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, মেয়েটির পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করা হবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও নেবেন খোদ এমডি। কিন্তু যোগদানের মাস কয়েক পর থেকেই বদলে যায় সেই উচ্চবিত্ত পরিবারের আচরণ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুটির দেখা করতে বাধা দেওয়া শুরু হয় এবং শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন।
গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শিশুটিকে যখন তার মায়ের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, তখন মেয়ের বীভৎস দগদগে ক্ষত দেখে মা সংজ্ঞা হারানোর উপক্রম হন। বর্তমানে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটি সেই ভয়াবহ দিনগুলোর বর্ণনা দিয়েছে:
নির্যাতনের ধরণ: তুচ্ছ কোনো কারণে বা সামান্য অজুহাতে শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করা হতো।
পৈশাচিক আচরণ: আগুনের শিখায় খুন্তি লাল করে শিশুটির কোমল হাত ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো।
শুরু ও ব্যাপ্তি: শিশুটির বয়ান অনুযায়ী, গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে এই অমানবিক নির্যাতনের মাত্রা চরমে পৌঁছায়। বিমানের এমডি, তাঁর স্ত্রী এবং বাসার অন্য গৃহকর্মীরা এই পৈশাচিকতায় লিপ্ত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা হওয়ার পর পুলিশ তাৎক্ষণিক তৎপরতা চালিয়ে সোমবার দিবাগত রাতে উত্তরার বাসা থেকে চারজনকে গ্রেফতার করে।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন-
১. ড. মো. সাফিকুর রহমান (এমডি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স)
২. বিথী (সাফিকুরের স্ত্রী)
৩. রুপালী খাতুন (গৃহকর্মী)
৪. সুফিয়া বেগম (গৃহকর্মী)
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদের আদালতে আসামিদের হাজির করা হলে তাঁদের আইনজীবীরা জামিন প্রার্থনা করেন। তবে অপরাধের গুরুত্ব ও নির্মমতা বিবেচনা করে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁদের সবাইকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থেকেও এমন অমানবিক আচরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে নিন্দার ঝড়। সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে যেন তিনি কোনোভাবেই ছাড় না পান। শিশুর নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের এই চরম লঙ্ঘনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন নাগরিক সমাজ।
যে হাত দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা, সেই হাতেই একটি অসহায় শিশুর গায়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগ আজ বিচারিক প্রক্রিয়ায়। সাফিকুর রহমান ও তাঁর পরিবারের এই পতন আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই এক চরম প্রতিচ্ছবি।
এএন