ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বেকারত্বে পুড়ছে তরুণ সমাজ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

জুন ২৩, ২০২৬, ০১:০৬ এএম

বেকারত্বে পুড়ছে তরুণ সমাজ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট আর বিনিয়োগের মন্থর গতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে, তখন নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজের একটি বিশাল অংশ আজ বেকারত্বের করাল গ্রাসে পতিত হয়ে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। কাগজে-কলমে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট কিংবা উৎপাদনশীল খাতকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো সম্পূর্ণ অন্ধকার।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সাধারণ বেকারত্বের হার ৫ শতাংশের নিচে হলেও স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করা তরুণদের মধ্যে এই হার বর্তমানে ১৩.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে; যা জাতীয় হারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ যুবসমাজ বর্তমানে ‘নিট’ শ্রেণিভুক্ত, অর্থাৎ তারা কোনো ধরনের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা পেশাদার প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত নেই। প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা ২২ লাখ নতুন চাকরিপ্রার্থীর বিপরীতে অর্থনীতি মাত্র ১৪ লাখের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে, যার ফলে বাকি আট লাখ তরুণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ কর্মহীন থেকে যাচ্ছে। গত দুই দশকে দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে এক ডজনেরও বেশি মেগা প্রকল্প নেয়া হলেও বাজার চাহিদার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দূরত্বের কারণে ‘স্কিল মিসম্যাচ’ সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

এই পুঞ্জীভূত যুব বেকারত্ব কেবল এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না, বরং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ দেশকে এক বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বেসরকারি খাতকে গতিশীল করে কর্মসংস্থানের চাকা সচল করার মূল লক্ষ্য নিয়ে২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বাজেট পেশ করা হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১.৪ শতাংশ বিনিয়োগে উন্নীত করার লক্ষে নির্ধারণ করেছে। এই বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রাকে অর্জনের জন্য দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ২৪.৯ শতাংশ ও সরকারি খাতে বিনিয়োগ ৬.৫ শতাংশ।

দেশের থমকে যাওয়া উৎপাদনশীল খাতকে টেনে তুলতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

এই তহবিলের একটি বড় অংশ হিসেবে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে। এই স্কিমের আওতায় ক্ষুদ্র ও শ্রমঘন শিল্পের উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সহজ শর্তে, মাত্র ৪ শতাংশ স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন, যা কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কাগজে-কলমে সরকারের এত বড় পরিকল্পনা, কোটি কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা আর নীতিগত ঘোষণা থাকার পরও মাঠপর্যায়ে বেকারত্বের হার না কমার পেছনে গভীর এক কাঠামোগত সংকট কাজ করছে। পরিসংখ্যান ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের বেকারত্ব সমস্যার বর্তমান চিত্র নিম্নরূপ-

১. উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চ হার: বর্তমানে দেশে স্নাতক বা গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। এই হার দেশের সামগ্রিক জাতীয় বেকারত্বের হারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। অর্থাৎ, শিক্ষার ডিগ্রি যত বাড়ছে, কর্মসংস্থান পাওয়ার নিশ্চয়তা ততটাই কমছে।

২. যুব বেকারত্ব বনাম সাধারণ বেকারত্ব: পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি যুবকদের মধ্যে সার্বিক বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে দেশের সামগ্রিক সাধারণ বেকারত্বের হার ৫ শতাংশেরও কম। এটি স্পষ্ট করে যে, দেশের বেকারত্ব সমস্যাটি মূলত একটি ‘যুব সংকট’।

৩. ‘নিট’ শ্রেণীর আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি: সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ যুবক-যুবতী বর্তমানে ‘নিট’ শ্রেণীভুক্ত। অর্থাৎ, এই বিশালসংখ্যক তরুণ এই মুহূর্তে কোনো ধরনের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো পেশাদার প্রশিক্ষণের সঙ্গেই যুক্ত নন। এই বিপুল জনশক্তি সম্পূর্ণ অনুৎপাদনশীল অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই প্রবৃদ্ধি মূলত ‘কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’। এটিকে শুধুমাত্র তরুণদের শিক্ষার অভাব বা ব্যক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতারই ফসল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণ করলে শ্রমবাজারের এক বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা ফুটে ওঠে। বার্ষিক নতুন চাকরিপ্রার্থী: প্রায় ২২ লাখ তরুণ প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। বার্ষিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দেশীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে মাত্র ১৪ লাখের মতো। ঘাটতি: প্রতি বছরই এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ প্রায় আট লাখের মতো নতুন চাকরিপ্রার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ কর্মহীন থেকে যাচ্ছেন।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এক ডজনেরও বেশি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের সুবাদে দেশজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ও পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো সম্ভব হয়নি। উল্টো বাজার চাহিদার সাথে শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্বের কারণে ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অমিলজনিত সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, করপোরেট বা শিল্প খাত সেই ধরনের দক্ষতা পাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সাধারণ শিক্ষাবস্থার দুর্বল ভিত্তির ওপর অতিরিক্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের চাপ আদতে কোনো টেকসই সমাধান আনে না। যেহেতু বর্তমানের আধুনিক কর্মক্ষেত্র অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই তরুণদের কোনো নির্দিষ্ট মেকানিক্যাল কাজের ফ্রেমে বন্দি না করে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তারা পরিবর্তিত সময়ের সাথে সাথে যে কোনো নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা সহজে আয়ত্ত করতে পারে। নিজেদের কাজের উপযোগী করে পুনর্গঠিত করার মানসিকতা ও ‘চটপটে দক্ষতা’ অর্জন করতে পারে।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার এক দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন দেখছে বর্তমান বিএনপি সরকার। তবে এই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে এই বিশাল শিক্ষিত ও বেকার যুবসমাজকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর। কিন্তু বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ এই লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে- রাজস্ব ঘাটতি ও সরকারি ঋণ: বর্তমানের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এবং মেগা প্রকল্পের খরচ মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করছে।

ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য কমছে এবং বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। ডলার সংকট ও উৎপাদন খরচ: ডলার সংকটের কারণে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সাথে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের চাপে বড় বড় উদ্যোক্তারা নতুন কর্মী নিয়োগ দেয়া সম্পূর্ণ স্থগিত রেখেছেন। ফলে কেবল প্রণোদনা প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।

আগামী দিনের বাজেটের আসল সফলতা কাগজের উন্নয়ন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির অঙ্ক কিংবা ব্যয়ের বিশাল পরিসংখ্যানে নির্ধারিত হবে না। বরং বাস্তবে কত লাখ বেকার তরুণের হাতে নতুন চাকরির নিয়োগপত্র পৌঁছাল তার ওপরই এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে।

সরকারকে কেবল আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার নীতি থেকে বের হয়ে এসে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, ডলার সংকট দূর করা এবং শিক্ষার সাথে শিল্পের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। অন্যথায়, এই পুঞ্জীভূত বেকারত্বের সামাজিক ক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক চাপ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে এক বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।

Link copied!