নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২, ০১:৫৯ এএম
উত্তরবঙ্গের ছয় লেনের মহাসড়ক নির্মাণকাজ বেশ আগেই শুরু হয়েছে। এবারে বড় আকারে রেলপথ সংযোগের আওতায় আসতে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গ। যার শুরুটা হচ্ছে যমুনা নদীর ওপরে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু দিয়ে। রেল বিভাগ বলছে, পুরো দেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সেই উদ্যোগের একটি অংশ উত্তরের জনপদের রেলসংযোগ সংস্কার ও নতুন রেলপথ সংযোজন। নসবকিছু ঠিক থাকলে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু দিয়ে যেখানে ৩৮টি রেল চলাচল করতে পারে, সেখানে সেতু নির্মিত হলে প্রতিদিন ৬৮টি রেল চলাচল করতে পারবে। নতুন এ রেল সংযোগ চালু হলে দেশের উত্তরাঞ্চলে অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একইসাথে এই সেতুতেই আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে ভারতের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নীলফামারীর চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজও চলছে। এ মহাকর্মযজ্ঞে রেলসেবার আধুনিকায়ন ও অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রকল্পটির পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, জুলাই-২০২২ পর্যন্ত রেলের মোট ৩৬টি প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে সোয়া এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। আর এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৫ নং মেগা প্রকল্পটি হচ্ছে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু রেলওয়ে সেতু। শুরুতে প্রাথমিকভাবে সেতুর অনুমোদিত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি সাত লাখ টাকা।
পরে উদ্বোধনের আগেই নির্মাণ ব্যয় বেড়ে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে জাপানি আন্তর্জাতিক সংস্থা (জাইকা) ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা সহায়তা প্রদান করছে। বাকি অর্থ বাংলাদেশের। ইতোমধ্যে এই সেতুর ৩৮টি পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শেষের দিকে। জুন পর্যন্ত এই সেতুর অগ্রগতি ৪২ শতাংশ। দিন যতই যাচ্ছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু। সেতুটি নির্মাণ হলে একদিকে যেমন উত্তরের যোগাযোগ খাতে নবদিগন্তের সূচনা হবে, তেমনি খুলবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারও।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশেই ৪.৮ কিলোমিটার দুই লাইনের রেলসেতুর ৫০টি পিলারের মধ্যে ৩৮টির অধিক পাইলিংয়ের কাজ শেষ। বাকিগুলোর কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। সেখানে রাত-দিন কাজ চলছে। ২০২১ সালের মার্চে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে শেষ হওয়া পিলারগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। তবে মাঝামাঝি পর্যায়ে সিরাজগঞ্জ অংশে বাদ রয়েছে ৮টি পিলারের পাইলিং কাজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে প্রকল্প এলাকায় চলছে মহাকর্মযজ্ঞ। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে পাইলিংসহ সেতু নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট নানা কাজ। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয়েছে প্রকল্প এলাকা। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উজানে সেতুর পূর্ব-উত্তর পাশের গাইড বাঁধের কাছ থেকে পাইল বসানোর কাজ শুরু হয়। এখন ভারী ক্রেনের সাহায্যে হ্যামার দিয়ে বসানো হচ্ছে পাইলিং পাইপ। হ্যামারের শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো প্রকল্প এলাকা। প্রকল্পে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।
রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৪.৮ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলসেতু নির্মাণ। এ প্রকল্পের মধ্যে আর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে উভয় প্রান্তে ০.০৫ কিলোমিটার ভায়াডাস্ট, প্রায় ৭.৬৬৭ কিলোমিটার রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ এমব্যাংকমেন্ট এবং লুপ ও সাইডিংসহ মোট প্রায় ৩০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ। এছাড়া সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে থাকবে নতুন স্টেশন ভবন, ইয়ার্ড রিমডেলিং এবং রেলওয়ে সেতু মিউজিয়াম। একই প্রকল্পের আওতায় কিছু নদীশাসন ও সংস্কার কাজও করা হচ্ছে।
এদিকে যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় প্যারালাল রেলসেতুর সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন কাজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জানা গেছে, ২০২২ সালের মে মাসে রেল ভবনে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে জাপানি কোম্পানি ইয়াসিমা জেএসইর (জয়েন্ট ভেনচার) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বাংলদেশ রেলওয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রকল্প পরিচালক ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমার এবং জাপানি কোম্পানি ইয়াসিমার অথরাইজড পার্সন নরিয়ো ইকোজিমা। জাইকার অর্থায়নে প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ৪৭ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৬৬৫ টাকা। ২৮ মাসের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করা হবে। প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, নতুন এই রেলসেতুর ডিজাইনটি দৃষ্টিনন্দন হবে।
তাছাড়া ব্রিজে লাইটিং থাকছে। স্বাভাবিকভাবে রেলসেতুতে লাইটিং থাকে না। সুতরাং এই রেলসেতুতে এটি নতুন সংযোজন। এছাড়া বিশেষ সুবিধার মাঝে একত্রে দুটি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে করে ট্রেন চলাচলের ইফিসিয়েন্সি বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, এখন বঙ্গবন্ধু সেতুতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারে। এই সেতুটিতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলতে পারবে। এটির ওপর দিয়ে যে কোনো ওজনের মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেন চলতে পারবে। এই ব্রিজটির ওপর দিয়ে একাধিক লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানো যাবে।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে রেলপথে পণ্য পরিবহনে কী কী সুবিধা থাকবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প পরিচালক বলেন, আমদানি-রপ্তানিজাত পণ্যের সবকিছুই পরিবহন করা হয় কনটেইনারের মাধ্যমে। ভারতের সাথে আমাদের ফ্রেড ট্রেনের মুভমেন্ট থাকলেও তা সাধারণত বাল্ক ম্যাটেরিয়াল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব ট্রেনে সাধারণত পাথর এবং পশুখাদ্য পরিবহন করা হয়। কিন্তু কনটেইনারের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারলে দেশের মানুষের জীবনমান সমৃদ্ধ হবে। দেশে সমুদ্রপথে ভারত থেকে একটি পণ্য আসতে প্রায় সাত থেকে আট দিন সময় লাগে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রেলসেতু চালু হলে এ সময়টাও কমে আসবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা গেলে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই সহজে সেবা পাওয়া যাবে। দ্রুত সময়ে একাধিকবার টার্নওভার করার সুযোগ হওয়ায় দেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপর সুপ্রভাব পড়বে।