ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল

মহিউদ্দিন রাব্বানি

জুলাই ১৪, ২০২৩, ১১:৩২ পিএম

ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল

অটোগ্যাস  

১২ কেজি ৫৫৯
কেজিপ্রতি ৪৬.৫৯

এলপিজি 

১২ কেজি ৯৯৯
কেজিপ্রতি ৮৩.২৫ 
*টাকার অঙ্কে দামের পার্থক্য ৪৪০ 

  •  দামের সুবিধায় অবৈধ সিলিন্ডারে ঝুঁকছেন গ্রাহক
  • ব্যবহারে সচেতন হওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের 
  • বালি ও পানি মিশিয়ে ওজনে প্রতারণা
  • প্রতিবছর গড়ে সহস্রাধিক সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল করার শত শত কারখানা। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের এসব সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল কিংবা সরবরাহ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিভিন্ন সময় বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও থেমে নেই অবৈধ এসব কারখানার কাজ। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে যেন বেখবর। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তুলনায় অবৈধ এসব রিফিল গ্যাসে ৪০০-৪৫০ টাকা কমে পাওয়া যায় বলে জানায় ক্রেতারা। ফলে দামের সুবিধায় ঝুঁকি বিবেচনা না করেই সিলিন্ডার নিয়ে ভোক্তা ছুটছেন অটোগ্যাস স্টেশনে। এতে ঘটতে পারে প্রাণহানির মতো বড় দুর্ঘটনা। 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এক কেজি অটোগ্যাসের দাম ৪৬ টাকা ৫৯ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজি এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) যদি কেউ রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে নেয় খরচ পড়ে ৫৫৯ টাকা। কিন্তু এলপিজি অপারেটরদের কাছে একটি এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম ৯৯৯ টাকা। যদি ধরে নেয়া হয় সরকার নির্ধারিত দামেই সারা দেশে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে তাহলেও দুই দামে পার্থক্য ৪৪০ টাকা। এসব অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে জ্বালানি বিভাগে অভিযোগ জানিয়েছে বিইআরসি। অবৈধ এই প্রক্রিয়া রুখতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই আবাসিক এলাকার খালি জায়গা বা ঘর ভাড়া নিয়ে তৈরি এই কারখানাগুলোকে ‘মৃত্যুকূপ’ বলছেন। আর এসব গ্যাস যখন রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বিস্ফোরণের মতো বড় দুর্ঘটনা। এদিকে বড় সিলিন্ডার ভেঙে গ্যাস কম দেয়ার জন্য বালি ও পানি মিশিয়ে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের’ ছোট ছোট সিলিন্ডারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভরতে গিয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা এবং মানুষের প্রাণ গেলেও প্রশাসন ও পুলিশ বলছে, এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না বলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে বাসা-বাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে সচেতন হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।  ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে দুটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এর বেশিরভাগই বাসা-বাড়িতে। আর এ বিস্ফোরণের জন্য অন্যতম দায়ী ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। গ্যাস সিলিন্ডার লিক হয়ে আগুন লেগে ওই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়। পরদিন চিকিৎসাধীন একজন মারা যান। এরপর চলতি বছরের শুরুর দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি মারা যায় শিশু লাবণী। এ ঘটনায় লাবণীর মা আক্তারের শরীরের ২৩ শতাংশ ও ভাই ইয়াছিনের শরীরের ৮ শতাংশ পুড়ে যায়। চলতি মাসের ২ তারিখ রাজধানীর ভাটারায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় আব্দুল মজিদ শিকদার ও তাসলিমা বেগম নামে এক দম্পতির। উভয় ঘটনায়ই পুলিশ ঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে লিকেজ ছিল বলে জানায়। চুলায় আগুন ধরাতে গিয়েই প্রাণ দিতে হয় তাদের। এর কিছুদিন আগেই মিরপুরে বেলুনে গ্যাস ভরতে গিয়ে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সিদ্দিক মিয়া নামের ৬০ বছর বয়সি ব্যক্তি।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৮৯৪। অর্থাৎ দিনে গড়ে দুটির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মোহা. নায়েব আলী বলেন, দুর্ঘটনাগুলো মূলত গ্যাসের লিকেজ থেকে ঘটে। সিলিন্ডারের হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভালভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। সেই লিকেজ থেকে গ্যাস বেরিয়ে বাইরে কোথাও জমতে থাকে। সামান্য আগুন, এমনকি স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা সেই গ্যাস ভয়াবহ বিস্ফোরণের সৃষ্টি করে। 

একের পর এক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দুষছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে। তাদের দাবি, একটি গ্যাস সিলিন্ডার ন্যূনতম ২০ বছর ব্যবহার করার কথা। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে কয়েক দফায় রেগুলেটর ও ভালভ পরিবর্তন করতে হয়। এ দুটি যন্ত্রাংশই মূলত গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশের সিলিন্ডারগুলোয় মানহীন রেগুলেটর ও ভালভ ব্যবহারের ফলে লিকেজ সৃষ্টি হয়। অথচ সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। কিন্তু যথাযথভাবে এসব গ্যাস সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করা হয় না। আর এ সুযোগে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশ।  সবশেষ ১৩ মে ফ্যান্টাসি কিংডমের পাশে তেঁতুলতলা এলাকায় গ্যাস ভরার সময় বিকট বিস্ফোরণে ৯ বছরের শিশুসহ পাঁচ শ্রমিক গুরুতর দগ্ধ হয়; তাদের মধ্যে চারজনই রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে ৪ মে আশুলিয়ার কাঠগড়ায় রাতের আঁধারে এমন আরেকটি কারখানায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণে গোটা এলাকা কেঁপে উঠে। সেখানে কেউ আহত না হলেও আশপাশের বাড়িঘর, বিদ্যুৎ লাইন, পানির ট্যাংক দোকান ও গাছ পুড়ে যায়। খসে পড়ে বিভিন্ন বাড়ির ছাদের ও দেয়ালের পলেস্তারা। এছাড়া এসব কারখানায় ছোটখাট অনেক দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকপক্ষ তা ধামাচাপা দেয় কিংবা ‘ম্যানেজ’ করে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত কয়েকদিনে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের কারখানার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি বিরাট চক্র এই অবৈধ ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রণ করে। এরা খোলাবাজারের এজেন্টদের কাছ থেকে বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির ৪৫ লিটার, ৬০ লিটার, ৬৪ লিটারের বড় বড় সিলিন্ডার কিনে নেয়। তারপর সেগুলো ভেঙে ছোট ছোট সিলিন্ডারে ভরা হয়। এসব অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়ীরা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব কারখানা পরিচালনা করছে। এলপি গ্যাস সরবরাহকারী বড় কোম্পানিগুলোর ডিলারদের কাছেও এসব অজানা নয় দাবি করে এক ব্যবসায়ী বলেন, তারা বিক্রি বাড়িয়ে টার্গেট পূরণ করার জন্য সবসময় চুপ থাকেন। আশুলিয়ার এলপি গ্যাসের ডিলার নজরুল ইসলাম বলেন, এরপর ৪৫ কেজির একটি বড় সিলিন্ডারের গ্যাস দিয়ে ১২ কেজির পাঁচটি সিলিন্ডার ভরা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি সিলিন্ডারে তিন কেজি করে গ্যাস কম দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১২ কেজির এসব সিলিন্ডার পরিচিত কোম্পানির হওয়ায় সাধারণ গ্রাহক সন্দেহও করে না। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।

নবীনগরের স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন বলেন, একদিন ভেতরে গিয়ে দেখি বোতলে তারা গ্যাসের সঙ্গে বালু ও পানি ভরছে। এসব কথা প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু কিছুই তো হয় না। আশুলিয়ায় অন্তত অর্ধশত এমন রিফিলের অবৈধ কারখানা রয়েছে। সম্প্রতি একটি অবৈধ রিফিলের কারখানায় বিস্ফোরণের পর এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় ছোট-বড় নানা আকারের সিলিন্ডার। ছোট সিলিন্ডারে দুই কেজি বালু ও এক কেজি পানি ভরেন তারা। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডিইপিজেড স্টেশনের ওয়্যারহাউজ পরিদর্শক ওয়ালি উল্লাহ বলেন, এসব সিলিন্ডারের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে এসব সিলিন্ডার ধ্বংস করে দেয়ার কথা। কিন্তু কিছু অসাধু সেগুলো ধ্বংস না করে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দেয়। ভাঙারির দোকান থেকে এসব সিলিন্ডার কিনে নিয়ে গ্যাস রিফিলের কাজে লাগানো হয় বলে ধারণা করি।

কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কাজ বেশিরভাগ সময়ে গোপনে করা হয়। কাজগুলো করার জন্য সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। যারা রাতের আঁধারে এসব কাজ করে থাকে। বিশেষ করে যারা এলপিজি বিক্রি করে থাকে তারা এক সঙ্গে অনেকগুলো খালি সিলিন্ডার নিয়ে এসে রিফুয়েলিং স্টেশনে ভর্তি করে নিয়ে যায়। এতে সিলিন্ডার প্রতি তাদের আয় বেড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হয়। বাংলাদেশ এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম খান আমার সংবাদকে বলেন, আমরা সমিতির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবার র্যাবকে এ ব্যাপারে কাজ করার সুপারিশ করে। আসলে মানুষ সস্তা জিনিস খোঁজে, ঝুঁকির কথা ভাবে না। তাই এই ধরনের কর্মকাণ্ড বাড়ছে। এদিকে আমাদের অপারেটরদেরও বলা হয়েছে কড়া নজর রাখতে।
 

Link copied!