আব্দুল কাইয়ুম
আগস্ট ২৪, ২০২৩, ১১:৫৩ পিএম
ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পারলে সরকারের ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে
—সাইদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকাকে ‘রেড জোন’ ও ‘গ্রিন জোন’-এ ভাগ করে অভিযান পরিচালনা করা হয়
—মো. মুনিরুজ্জামান, সম্পত্তি কর্মকর্তা, ডিএসসিসি
রাজধানী ঢাকাতে ফুটপাত দখল স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে মানুষ হাঁটার জন্য। কিন্তু হকাররা তা দখল করে ব্যবসা করে যাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ চলাচল করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে সবাই মূল সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
শুধু তাই নয়, ট্রাফিক পুলিশ বলছে, ঢাকাতে যানজট সৃষ্টি হওয়ার প্রধান কারণ হলো মানুষ ফুটপাত ব্যবহার না করে মূল সড়ক দিয়ে চলছে। এ কারণে গাড়ি চলার জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সড়কে প্রাণ হারানো মানুষের ৪৩ শতাংশই পথচারী। এদের সবাই ফুটপাতে না চলে রাস্তা দিয়ে চলেছেন। এর মূল কারণ হলো ফুটপাতের সঠিক ব্যবহার না থাকা। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে ফুটপাত থাকলেও তা হকারদের দখলে।
পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার মোট যাতায়াতের ৩৭ দশমিক ২ শতাংশই হয় পায়ে হেঁটে। আর সেই পায়ে হেঁটে চলার পথই দখলদারদের কব্জায়। যারা এ বিশাল পরিমাণের ফুটপাত দখলে রেখে বাণিজ্য করছেন এরা সবাই শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভয়ে কিছু বলছে না, আর দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব যাদের তারাও চুপ আছেন অজ্ঞাত কারণে।
বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার যানজটের প্রধান কারণ রাস্তার সংকট। যেকোনো স্মার্ট শহরের জন্য ওই শহরের আয়তন ও জমির পরিমাণ অনুযায়ী তার ২৫ শতাংশ রাস্তা দরকার। কিন্তু সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক পিছিয়ে ঢাকা শহর। কেননা, এই শহরের প্রধান সড়কগুলোর আয়তন মাত্র ৩ শতাংশ। আর বিভিন্ন অলিগলিসহ সর্বসাকুল্যে সড়ক রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তিনভাগের একভাগ সড়কও নেই ঢাকায়। আবার যে ৩ ভাগ প্রধান সড়ক রয়েছে, তার সংশ্লিষ্ট যে ফুটপাত রয়েছে তারও ৭০ শতাংশ দখল করে আছে শক্তিমানরা, যারা এসব দখলীয় অংশ হকারদের কাছে দৈনিক, সাপ্তাহিক অথবা মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরের মোট এলাকা ১৩৫৩ বর্গকিলোমিটার আর ঢাকার বর্তমান রাস্তার আয়তন দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক।
বেসরকারি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকায় মানুষ হাঁটার জন্য দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার ফুটপাতের প্রয়োজনীয়তার বিপরীতে মাত্র ৫১৫ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। ৪৪ শতাংশ সড়কেই কোনো ধরনের ফুটপাত নেই। বিদ্যমান ফুটপাতের ৭০ শতাংশই দখল হয়ে আছে হকারদের দ্বারা। এর মধ্যে ২২ শতাংশের অবস্থা অত্যন্ত নিম্নমানের যা দিয়ে হাঁটা যায় না। আর ব্যবহার উপযোগী আছে মাত্র ৮ শতাংশ। যা দিয়ে জনবহুল ঢাকাতে চলাচল খুবই কষ্টকর।
হকারদের ফুটপাত দখলের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক নেতাদের হাত। বিভিন্ন নেতাদের হাত ধরে জায়গা নিতে হয়। তার জন্যও দিতে হয় মোটা অংকের টাকা। এক অনলাইন জরিপের প্রতিবেদনে উঠে আসে, রাজধানীতে হকারের সংখ্যা দুই লাখ ৬০ হাজারের মতো। এর মধ্যে দেড় লাখ ফুটপাতে বসে। ২৫ হাজার রাস্তায় দোকানদারি করে। আর বাকিরা মৌসুমি হকার। এদের কাছ থেকে প্রতিদিন স্থানভেদে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। ঈদ বা উৎসবে চাঁদার হার তুলনামূলক বাড়ে। রিপোর্টে একটি হিসাব দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতি হকারের কাছ থেকে যদি দৈনিক গড়ে ১০০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয় তাহলে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০০ কোটি টাকারও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হকার থেকে পাওয়া বিশাল অংকের টাকা কোথায় যায় তা সবাই জানেন। সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় চলতে সমস্যা হয়। বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করতে হয়। গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি ঘটছে নানা দুর্ঘটনাও। প্রতিবছর শত শত মানুষ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ফুটপাত হকারমুক্ত করতে না পারলে যানজট নিরসন সম্ভব না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মুনিরুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, প্রতিনিয়ত আমাদের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে থাকেন। অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকাকে ‘রেড জোন’ ও ‘গ্রিন জোন’ ভাগে ভাগ করা হবে। আর সে অনুযায়ী অভিযান পরিচলনা করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করে বারবার এ বিষয়ে জানতে চাইলেও তারা কথা বলতে অপারগতা পোষণ করেন।
এ বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, রাজধানীতে যে পরিমাণ সড়ক থাকার দরকার তা নেই। শহরের তুলনায় আছে মাত্র ৭ শতাংশের কম। সব ফুটপাত বেদখল হয়ে আছে। অধিকাংশ জায়গায় ফুটপাত হকারদের দখলে। ৭০ শতাংশের বেশি ফুটপাত হকাররা দখল করে রেখেছে। আমরা যদি ফুটপাত দখলমুক্ত করতে পারি তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকা সরকারের সাশ্রয় হবে। যানজট কমার ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তাছাড়া রাস্তায় প্রায় ৭৫ শতাংশ জায়গা রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি দখল করে আছে। গণপরিবহন মাত্র ২৫ শতাংশ জায়গায় চলে। হকারদের কারণে মানুষ রাস্তায় চলে আর এতে যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি গাড়ির জন্য আলাদাভাবে লেন থাকলে তখন এতটা সমস্যা হতো না।