অক্টোবর ৪, ২০২৩, ১১:৫১ পিএম
আজ ৫ অক্টোবর। বহুল আলোচিত-সমালোচিত রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ‘ইউরেনিয়াম’ হস্তান্তর করা হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে শুরু হচ্ছে। তবে এই ইউনিটে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে ২০২৫ সালের শুরুতে।
গ্রাহকরা ২০২৫ সালে এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার প্রকল্প পরিদর্শনে এসে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে। এর প্রায় ১০ মাস পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাবে।
আজ জ্বালানি ইউরেনিয়াম হস্তান্তের মধ্য দিয়ে নিউক্লিয়ার ক্লাবের ৩৩তম গর্বিত সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পাবনার রূপপুরে চলছে সাজ সাজ রব। ইতোমধ্যেই রূপপুরে পৌঁছে গেছে আংশিক ইউরেনিয়াম রড। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে রূপপুরে নেয়া হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জ্বালানি ইউরেনিয়াম রড। এর আগে রাশিয়ার একটি কারখানা থেকে একটি বিশেষ বিমানে করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পারমাণবিক জ্বালানির এই চালান আনা হয়। রাশিয়ার নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে (এনসিসিপি) এই জ্বালানি উৎপাদিত হয়। রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চুক্তিবদ্ধ রয়েছে রোসাটম। পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞ পদ্মার পশ্চিম তীর ভেড়ামারা থেকেও দৃশ্যমান। আকাশে উঁকি দেয়া কুলিং টাওয়ারগুলো কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঈশ্বরদী ইপিজেড থেকেও স্পষ্ট। প্রত্যেকটি টাওয়ারের উচ্চতা হবে ১৭৫ মিটার। পুরো এলাকাজুড়ে চলছে রাজ্যের ব্যস্ততা, কারো যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। রাত-দিন বিরামহীন চলছে ভিশনারি প্রকল্পটির নির্মাণযজ্ঞ।
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. শৌকত আকবর বলেছেন, নিউক্লিয়ার এনার্জি ক্লিন এনার্জি হিসেবে প্রমাণিত টেনকোলজি। আমরা যে অঞ্চলে বাস করি অনেক আগেই একে ক্লিন এনার্জি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের জন্য নিউক্লিয়ার এনার্জিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। সারা বিশ্বে যে কার্বন নিঃসরণ হয় তার এনার্জি খাত থেকেই দুই-তৃতীয়াংশ। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচের এই প্রকল্পে ৯০ ভাগ টাকা ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রূশ ঠিকাদার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ এ প্রথম ইউনিট থেকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং একই পরিমাণ বিদ্যুৎ দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ২০২৪ সালে উৎপাদন হওয়ার কথা। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে জার্মান প্রতিষ্ঠান সিমেন্স কাজকে জটিল করে তুলেছে। সিমেন্স ২৩৩-৪০০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশন সরবরাহ করার কথা ছিল। তারা সাব-স্টেশন সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানালে নতুন ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে চীনা কোম্পানিকে। তারা ২০২৩ সালের নভেম্বরে সরবরাহ করবে। অন্যদিকে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারছেন না। যে কারণে এক বছরের মতো পিছিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ইউনিট ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৫ সালে উৎপাদনে আসতে পারে।
বর্তমানে পৃথিবীর ৩০টি দেশে ৪৪৯টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ মোট উৎপন্ন বিদ্যুতের প্রায় ১২ শতাংশ। ১৪টি দেশে আরও ৬৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ ২৭টি দেশে ১৭৩টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। ইউরিনিয়ামের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম জানান, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালাতে ৭৫ টন ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হতে পারে। তবে ১৮ মাস পরপর প্রতিস্থাপন করতে হবে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৫ টন ইউরেনিয়াম। সেই পরিমাণ ব্যয়িত জ্বালানির রড চুল্লি থেকে তুলতে হবে। এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হবে এক হাজার ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ৬০ বছর ধরে ১৮ মাস পর পর মাত্র দুই মাসের মতো বন্ধ রাখা ছাড়া (নতুন জ্বালানি ভরা, ব্যয়িত জ্বালানি তোলা ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ কাজ) বাকি সময়টুকুতে নিরবচ্ছিন্নভাবে চুল্লি জ্বলতে থাকবে। অথচ এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১৮ মাস পরপর প্রায় এক কোটি টন কয়লা, ১৯ কোটি গ্যালন ডিজেল লাগত।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই পরিমাণ কয়লা ও তেল কিনতে লাগবে সাত হাজার ৩০০ ও ছয় হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু ২৫ টন ইউরেনিয়ামে ব্যয় হবে মাত্র হাজার কোটি টাকা। তিনি আরও বলেন, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্বন সালফার নির্গমনের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি করে যাচ্ছে। এ জন্যই পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। গতকাল বুধবার রূপপুরের প্রকল্প এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। তিনি বলেন, রূপপুর প্রকল্প জিডিপিতে ২ শতাংশ অবদান রাখবে। ২০২৫ সালের শুরুতে জনগণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) ২ শতাংশ অবদান রাখবে।
